হাওর সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে করণীয় কী?

হাসান হামিদ

আমার জন্ম সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চলের ছোট্ট এক গ্রামে। আমার শৈশব কেটেছে সেখানেই। মাত্র দুই দশক আগেও যে হাওর আমি দেখেছি, এখনকার হাওর-প্রকৃতি অনেকটাই আর তেমন নেই। হাওরাঞ্চলে বিভিন্ন এলাকায় আগে জঙ্গলের মতো জায়গা ছিল। সেইসব গাছের বেশির ভাগই কেটে সাফ করা হয়েছে। কারা কেটেছেন এসব হিজল-করচের ঘনবন? কিছু গাছ কেটেছে হাওরপারের মানুষজন। আর ইজারাদারেরা প্রতি বছর গাছ কেটে বিলে কাঁটা দিচ্ছেন দশকের পর দশক। ফলে কমে গেছে গাছ-গাছালির পরিমাণ। একসময় ঘন গাছের সারির কারণে বর্ষাকালে যেসব লোকালয়ে ‘আফাল’ এসে আঘাত করতে পারতো না অতোটা, এখনকার দিনে হালকা বাতাস দিলেই সেসব বাড়িঘরে আছড়ে পড়ে ঢেউ। অতীতে হাওরের বিলগুলোতে অনেক রকম জলজ উদ্ভিদ ছিল। জলজ উদ্ভিদের ফল ছিল বেশ স্বাধের। তাছাড়া এসব জলজ উদ্ভিদ ছিল অনেকটা মাছের নিরাপত্তা চাদরের মতোন। হাওরের পানিতে ঘন জলজ উদ্ভিদের কারণে কেউ চাইলেই জাল দিয়ে সব মাছ ধরতে পারতো না। ফলে হাওরে প্রচুর মাছ বাড়তো। আর এখন জলজ উদ্ভিদ নেই, পরিষ্কার পানিতে জাল দিয়ে ধরা হচ্ছে সব সাইজের মাছ। এজন্য আজকাল আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে হাওরের মাছ। ছোটবেলা দেখেছি, শীতে প্রচুর পাখি আসতো হাওরে। বিকেলে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াতো পাশের গ্রামগুলোতে। কিছু মানুষ জাল দিয়ে পাখি শিকার শুরু করলো। ধীরে ধীরে কমতে থাকলো পাখির সংখ্যা। এখন আগের মতো পাখি হাওরে আসে না। এভাবেই বদলে গেছে আমাদের হাওর সভ্যতার অনেক কিছু। বদলে যাওয়া হাওরের অনেক জায়গা দখল করে ভরাট করা হয়েছে, গড়ে উঠেছে লোকালয়, হাট-বাজার; সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই তৈরি হয়েছে সহস্র সড়ক। এখানকার নদীগুলোতে পলি জমেছে ভীষণ, এগুলো খনন করা হয়নি দীর্ঘদিন। আর ফসল রক্ষার নামে প্রতিবছর অপরিকল্পিতভাবে হাওরগুলোতে বাঁধ দেয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ব্যাপক বৃষ্টিপাত যখন হলো, তখন নাব্যতা সংকটের কারণে এবার হাওরে বন্যার ভয়ংকর রূপটি আমরা দেখলাম।

হাওরে বিশেষত সুনামগঞ্জে এবারের বন্যাটি ঠিক অতীতের বন্যার মতো ছিল না। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা বন্যা হয়। আকস্মিক বন্যায় পানিতে তলিয়ে যায় পুরো সুনামগঞ্জ এবং সিলেটের কিছু অংশ। সুনামগঞ্জ জেলা সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল অন্তত চার দিনের জন্য। জেলার প্রতিটি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছিল। পানিতে তলিয়ে যায় অসংখ্য বাড়িঘর, অফিস-আদালত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট। টানা চার দিন মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও বন্ধ ছিল। লাখ লাখ মানুষ আশ্রয় নেয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। অসহায় হয়ে পড়ে সবাই। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের অন্ধকারে ডাকাতের কবলে পড়ে কিছু এলাকা। এ যেন এক ভয়ঙ্কর দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা, অসহায়ত্ব। এখানকার মানুষ গত কয়েক যুগে এমন ভয়াবহ বন্যা কিংবা দুর্ভোগ দেখেনি। অবশ্য এখন সুনামগঞ্জে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। যদিও হাওরে কোনো কোনো এলাকায় বাড়িঘরে পানি আছে। এ কারণে অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আছে এখনো। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জেনেছি, সুনামগঞ্জে ৬২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর পানি কমতে শুরু করায় অনেকেই বাড়িঘরে ফিরেছে। এখনো ৩০০টি আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত ৫০ হাজারের মতো মানুষ আছে। আসলে সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার বেশিরভাগ লোকজন বাসাবাড়িতে ফিরতে পারলেও গ্রামের অনেকেই তা পারছে না। যাদের বাড়িঘর নিচু এলাকায় সেখানে পানি থাকায় তাদের ভোগান্তি এখনো বর্তমান। তবে বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর এখন অন্য সমস্যা দেখা দিয়েছে। নানা রোগবালাই বিশেষ করে ডায়রিয়া, চর্মরোগ এসব জেঁকে বসেছে।

প্রশ্ন হলো, সুনামগঞ্জে এবারের বন্যার ভয়াবহতা বেশি কেন ছিল? বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যার ব্যাপকতা দিন দিন বাড়ছে। প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে বলা যায়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে ব্যাপকভাবে গাছ এবং পাহাড় কাটা হচ্ছে অনেক দিন থেকেই। এই পাহাড়গুলো কিন্তু পানি শোষণ করতে পারতো। পাহাড় কাটার কারণে পানিশোষণ করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টি হয়েছে অনেক বেশি। সাধারণত ভারতের চেরাপুঞ্জীতে পুরো বছরে বৃষ্টি হয় ৫০০০ মিলিমিটার। কিন্তু এ বছর মাত্র ৬ দিনেই ১২০৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এত বৃষ্টির পানি সুনামগঞ্জে হাওরগুলোর ধারণ করার ক্ষমতা আসলেই নেই। এছাড়া হাওরগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ এবং রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, নদী খনন না করা এবং অবৈধ দখল এসব কারণে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। আর তাই এবার বন্যা পরিস্থিতি খুব খারাপ হয়েছে।

হাওর এলাকার ঠিক কতটুকু আসলে ভরাট-দখল হয়েছে? পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের সাত জেলায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর জায়গাজুড়ে মোট ৩৭৩টি হাওর রয়েছে। আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি হাওর রয়েছে সুনামগঞ্জে। এই জেলায় ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩১ হেক্টর ভূমিতে ৯৫টি হাওর রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের দুই শিক্ষার্থী ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের করা এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালের দিকে হাওরের আয়তন ছিল ৩ হাজার ৩৪ বর্গকিলোমিটার। আর ২০২০ সালে তা কমে হয়েছে ৪০৬ বর্গকিলোমিটার। এর মানে তিন দশকে দেশে হাওর কমেছে ৮৬ শতাংশ। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ গবেষণাটি করা হয়েছে। গবেষণায় ১৯৮৮, ১৯৯৪, ২০০০, ২০০৬, ২০১৩ ও ২০২০ সালের চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাওর ভরাট হয়েছে। এর মানে হলো, এতে হাওরে বৃষ্টির পানিধারণের ক্ষমতা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ফলে এবার সিলেটসহ আশপাশে বন্যার ভয়াবহতা দেখা গেছে। বৃষ্টি হলে হাওর এলাকা অতিরিক্ত পানি ধরে রাখে। এ ছাড়া হাওরের সঙ্গে নদ-নদীর সংযোগ থাকার কারণে প্রাকৃতিকভাবে হাওরের পানি নদীতে চলে যায়। এখন সমস্যা হলো, হাওরে যে নদীগুলো আছে সেগুলোরও পানি বহনের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। সাধারণত মেঘালয় বা আসাম থেকে আসা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নদী পথে হাওর থেকে বের হয়ে মেঘনা বা যমুনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। কিন্তু এ বছর বন্যার পেছনে হঠাৎ উজান থেকে আসা অতিরিক্ত পানি বের হতে পারেনি। কারণ নদীগুলোর নাব্যতা কমে গেছে। আবার এই যে নদীর নাব্যতা নষ্ট হলো এর জন্য ভারত অংশে অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনকে দায়ী করছেন অনেক গবেষক। বিশেষ করে ভারতের উজানে পাথর উত্তোলনের ফলে মাটি আলগা হয়ে নদীতে চলে আসে। ফলে নদীর তলদেশ ভরে যায়। আর এভাবে তৈরি হচ্ছে নাব্যতা সংকট। পাশাপাশি নদীগুলো ঠিকমতো খনন না করা, ময়লা-আবর্জনায় নদীর তলদেশ ভরে যাওয়া, ঘরবাড়ি বা নগরায়নের ফলে জলাভূমি ভরাট হয়ে যাওয়াও এর জন্য দায়ী। এই সমস্যা সমাধানের জন্য নদী খনন করা অত্যন্ত জরুরি। নদী খননের কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবু হাওরে এই কাজের জন্য সরকার বড় পরিকল্পনা নিবে বলে আশা করছি।

বন্যার ভয়াবহতা কমাতে সুনামগঞ্জ হাওরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। হাওরাঞ্চলে যেসব সড়ক বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে, এর বেশিরভাগই সুপরিকল্পিতভাবে হয়নি। আর সেটা না হওয়ার কারণেই এবার বন্যা এত ভয়াবহ ভাবে হয়েছে। উন্নয়নের নামে যেখানে খুশি রাস্তা বানানো, ভরাট করে স্থাপনা তৈরি এসব হাওরের সাধারণ চিত্র। হাওরের ভেতর দিয়ে যেসব সড়ক হচ্ছে, তার দুই পাশে বসতি গড়ে উঠছে। হাওরের পাড়েও গড়ে উঠছে বসতি। এ জন্য গত জানুয়ারি মাসে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন যাতে হাওরে এখন থেকে এলিভেটেড বা উড়াল সড়ক করা হয়। সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চলে অতীতে নদীতে নাব্যতা ছিল। সেই সময় এখনকার মতো এতো রাস্তাঘাট ছিল না। হাওরে এখন বিভিন্ন জায়গায় যত্রতত্র উঁচু বাঁধের মতো করে রাস্তাঘাট করা হয়েছে। এসব কারণে পানি প্রবাহে বাধার তৈরি হচ্ছে। ফলে বন্যার পানি এখন নেমে যেতেও সময় লাগে। সুনামগঞ্জ পৌর এলাকায় মানুষ ও বাসাবাড়ি দিন দিন বাড়ছে। নতুন বাসা তৈরি হচ্ছে অনেক জায়গা ভরাট করে। আবার অনেক এলাকায় বাড়িঘর তৈরির ফলে পানি আর গ্রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ আগের মতো পাচ্ছে না।

অনেকেই হয়তো জানেন না, হাওরাঞ্চল নিয়ে কাজ করার জন্য বাংলাদেশে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর আছে। অবশ্য অধিদপ্তর গঠনের ২২ বছর পরও হাওর-জলাভূমি সংরক্ষণে মাঠপর্যায়ে তারা কোনো কাজই করতে পারেনি। কেন পারেনি সে আরেক বিস্ময়! এই অধিদপ্তরের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, দেশের হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণের মাধ্যমে মানুষের টেকসই জীবনমান উন্নয়ন। এতে উন্নয়নের কথা বলা হলেও সুনির্দিষ্টভাবে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের কথা বলা নেই! গত ২২ বছর ধরে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসে মাসে বেতন-ভাতা খেলেও তাদের বলতে গেলে কোনো কাজ করতে হয় না। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৭ সালে ‘হাওর উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করা হয়েছিল। এর ঠিক ৫ বছর পর ১৯৮২ সালে তা বিলুপ্ত করা হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০০ সালে সরকার আবার ‘হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করে। এর ১৬ বছর পর অর্থাৎ ২০১৬ সালে এই বোর্ডকে অধিদপ্তরে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠার ২২ বছরেও মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ করতে পারেনি এই প্রতিষ্ঠান। তারা কয়েকটি সমীক্ষা করেছে আর মাঝখানে ২০১২ সালে হাওর মহাপরিকল্পনা তারা তৈরি করেছে অবশ্য। প্রতিষ্ঠার প্রায় ২২ বছরে বলার মতো এটুকু কাজ করেছে এই বোর্ড!

আসল কথা হলো, নদী এবং হাওর ভরাট করার কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, সেটা আমরা গত কয়েক বছর ধরেই টের পাচ্ছি। ভারী বৃষ্টি হলে এখন হাওরে প্রায় বছরই ফসলহানি হয়। এবার হলো ভয়াবহ বন্যা। তাছাড়া হাওরাঞ্চলের অনেক জীববৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে। অবশিষ্ট যেটুকু আছে, সেটুকুও হুমকির মুখে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় হাওরের পরিবেশ রক্ষা বিষয়টি অগ্রাধিকার পায় না। যেসব প্রকল্প করা হয় হাওরে, তাও উদ্দেশ্যমূলক লুটেরা বাহিনীর কাজ বলা যায়। আর এসব অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে উল্টো হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস হয়। সরকার যদি হাওর সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তাহলে এখনই কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করি।

হাওর সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে করণীয় কী?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top