স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা : মন্ত্রী কি এ ব্যর্থতার জবাব দেবেন?

হাসান হামিদ

সারাদেশে করোনা সংক্রমণের হার দিন দিন বাড়ছে, সেই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও। করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অর্থনীতি, ব্যবসা ও সমাজ জীবনে৷ আমাদের যাপিত জীবনের সবই প্রায় বদলে গেছে, হারাতে বসেছে অনেক আঁকড়ে রাখা অভ্যাস। আমরা নতুন ভাবে ভাবতে শিখছি, ভাবছি এবং এগিয়েও যাচ্ছি। কিছু থেমে নেই, তবে অনেক কিছু থমকে আছে। সারাক্ষণ একটা ভয় ভিতরে ভিতরে। এখন চলছে সর্বাত্নক লকডাউন। যদিও এই কঠোর বিধি-নিষেধেও কেউ কেউ বের হন। কাজে বাইরে যান অনেকে, আবার অকাজে বের হওয়া কাউকে কাউকে আটকের খবরও আমরা পেয়েছি। পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। রোগীরা ঢাকায় কিংবা বিভাগীয় শহরে ভিড় করছে, তাদের যে চিকিৎসা এখন দেওয়া দরকার, সেই ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জেনেছি, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পয়ত্রিশ জেলা সদরের সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ নেই। এই তথ্য নতুন নয়। তবে বর্তমানে অনেকে করোনা আক্রান্ত হলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে যান, তখন তাদের প্রয়োজন হয় নিবিড় পরিচর্যা। এ কারণে করোনা মহামারির একেবারে শুরু থেকেই ডাক্তাররা আইসিইউ প্রস্তুত রাখার ওপর জোর দিয়ে আসছিলেন। গত বছর করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময়ই বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ সংকট স্পষ্ট হয়েছিল। এখন যখন কথিত তৃতীয় ঢেউ চলছে। কিন্তু এইসব ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যা ছিল, তাই আছে। মাঝখান থেকে সময় গিয়েছে, আমাদের শিক্ষা হয়নি।

মনটা খুব খারাপ হলো, এবারও করোনা যোদ্ধা এক চিকিৎসককে জরিমানা করার সংবাদ পড়ে। গত ০২ জুলাই, শুক্রবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ঘটনাটি ঘটে। সেদিন সন্ধ্যায় রোগী দেখতে চেম্বারে যাওয়ার সময় ডা. ফরহাদ কবিরকে জরিমানা করেন ইউএনও মো. নজরুল ইসলাম। জানা যায়, সাতকানিয়া পৌরসভা এলাকায় রোগী দেখতে চেম্বারে যাওয়ার সময় গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ডা. ফরহাদ কবির নামের এক চিকিৎসকের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় ডা. ফরহাদ কবির লকডাউনে চিকিৎসকদের চলাচলে বিধিনিষেধ না থাকার বিষয়টি ইউএনওকে বললে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ডাক্তারদের সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‌‘আমি চাইলে আপনাকে জেল দিতে পারি। তা করলাম না। দ্রুত জরিমানা দিয়ে চলে যান।’ তখন বাধ্য হয়ে ডা. ফরহাদ কবির ১ হাজার টাকা জরিমানা দেন। অবশ্য এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। পরে তিন দিনের মাথায় চিকিৎসককে জরিমানাকারী ইউএনও মো. নজরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কে.এম. আল-আমীন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ দেওয়া হয়। ইউএনও প্রত্যাহার হওয়া দরকার ছিল। ডাক্তাররা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রশাসনের সকলকে সজাগ থাকতে হবে।

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুনছিলাম। সেখানে সমাপনী দিনে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেসবের উত্তর দেওয়ার কথা ছিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাহেবের। কিন্তু তিনি সেখানে সেদিন উপস্থিত ছিলেন না। কেন তিনি সংসদে ছিলেন না, আমি জানি না; তবে একটা কথা বলতেই হয়, সংসদীয় ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিদের প্রশ্নের জবাব মন্ত্রীকেই তো দিতে হবে। আর প্রশ্ন বা সমস্যা শুনার জন্য আমাদের মন্ত্রীরা বোধ হয় এতোটা অভ্যস্ত না।  যাই হোক, স্বাস্থ্য খাত নিয়ে নানা অভিযোগ নতুন নয়। অনেক দিন ধরেই নানা সমস্যায় এই খাত কীভাবে চলছে, তার জন্য এক বছরের পত্রিকা দেখলেই চলবে, বিরাট গবেষণার দরকার হবে না। বর্তমান সরকারের একাধিক মন্ত্রীও সংসদের বাইরে এ খাতের ব্যর্থতা-দুর্বলতা নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন সময়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যদিও প্রতিবারই অভিযোগ ও সমালোচনা অস্বীকার করেছেন এবং সবকিছু ঠিক আছে বলে সাফাই গেয়েছেন। আর আমাদের সমস্যা এটাই।

গত বছর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে করোনাভাইরাস ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ একটি গবেষণা করেছিল। তাদের প্রকাশ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে করোনাভাইরাস ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিনিয়োগের বিষয়টি যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। এ মহামারিতেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত অবহেলিতই থেকেছে। তাদের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান বরাদ্দের মাধ্যমে শুধু স্বল্পমেয়াদি ও তাৎক্ষণিক প্রয়োজনগুলো মেটানো সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিনিয়োগের বিষয়টি যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে কোভিড-১৯–সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে স্টাফদের চাহিদা নিরূপণ, মেডিকেল সরঞ্জামের সরবরাহ এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের প্রশিক্ষণের চাহিদা জানার দরকার রয়েছে। এ ছাড়া রোগতত্ত্ব , রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সামর্থ্য বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি অবস্থা চলাকালে কার্যক্রম বাস্তবায়নে দুর্নীতি মোকাবিলায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির উন্নত ব্যবস্থা থাকা দরকার বলে উল্লেখ করা হয় গবেষণায়। এ ছাড়া জরুরি অবস্থার অবসানে প্রকল্প শেষ করার উপযুক্ত পরিকল্পনা ছাড়াই এর মধ্যে একাধিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

আমার কাছে মনে হয়, করোনা মহামারি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে সেবাদান পর্যন্ত সবকিছু বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা দরকার। অনেকেই অভিযোগ করেন, মহামারির শুরু থেকে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ঠিকমতো হয়নি। পত্রিকার খবর বিশ্লেষণ করে বলা যায়, করোনা পরীক্ষার জন্য শুরুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পর্যাপ্ত ল্যাব টেকনিশিয়ান ছিলেন না। উপযুক্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবে ল্যাব টেকনিশিয়ানের ঘাটতি পূরণে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের স্বাস্থ্য প্রকল্প ‘আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার’ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ল্যাব টেকনিশিয়ানদের করোনা পরীক্ষার কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। আর জেলা পর্যায়ে করোনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সরকারি কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে সরকার ৬৪ জন সচিবকে দায়িত্ব দিয়েছিল। তাদের একেকজন একেকটি জেলার এসব কাজ সমন্বয় করবেন এ রকমই কথা ছিল। এর মধ্যে তারা কে কী করেছেন, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। কেউ বলবেন?

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যে আদেশে সচিবদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সরকারি কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তিন ধরনের কাজ করবেন। প্রথমত, দায়িত্ব পাওয়া সচিবেরা জেলার সাংসদ, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ ও সমন্বয় করে করোনাভাইরাস–সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা তত্ত্বাবধান করবেন। দ্বিতীয়ত, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পরিবীক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় করবেন এবং তৃতীয়ত, সমন্বয়ের মাধ্যমে পাওয়া সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ অথবা অন্যান্য বিষয় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থাকে লিখিতভাবে জানাবেন। তারা আদৌ কি তা করেছেন?

এবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকে নজর দেব। করোনাভাইরাস মহামারিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে হংকং। তালিকায় শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ও আয়ারল্যান্ড।  করোনার কারণে সারা বিশ্বই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে কঠিন এই পরিস্থিতিতেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য সেবার মান বজায় রেখেছে বেশ কিছু দেশ। এক্ষেত্রে নেতৃত্বের অবস্থানে রয়েছে এশিয়া। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশগুলোও তালিকায় পিছিয়ে পড়েছে। অর্থ-সম্পদে এগিয়ে থাকলেও এই র‌্যাঙ্কিংয়ের একেবারে তলানিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও রাশিয়া।  যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দ্য ব্লুমবার্গ হেলথ-এফিসিয়েন্সি ইনডেক্স-এর চলতি বছরের প্রতিবেদনে বিশ্বের বৃহত্তম ৫৭টি অর্থনৈতিক দেশে করোনায় মৃত্যুহার ও মহামারীকালীন জিডিপির অবস্থা অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।  ওই দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ নেই। 

গত বছর জুন মাসে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করতে হবে। আর তা করার জন্য তিনি কঠোর নির্দেশও দেন। এরপর এক বছরের বেশি সময় কেটে গেছে। কিন্তু অধিকাংশ জেলায় তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা যদি প্রতিপালিত না হয়, তাহলে কী বলার আছে? আরেকটা ব্যাপার হলো, এক বছর আগে যখন দেশের সব জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল, তখনই যদি উদ্যোগ নেওয়া যেত, তাহলে এতদিনে প্রয়োজনীয় জনবলের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা যেত। বিলম্বে হলেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে যাদের দায়িত্ব অবহেলায় এমন পরিস্থিতি, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। আর আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অস্বীকার করলেও স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম-ব্যর্থতা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। করোনা পরীক্ষা থেকে শুরু করে মাস্ক ও যন্ত্রপাতি ক্রয়, লোকবল নিয়োগে যে দুর্নীতি হয়েছে, তা অনেকটা প্রমাণিত। গত বছর বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল, তা-ও তারা খরচ করতে পারেনি। মন্ত্রী কি এ ব্যর্থতার জবাব দেবেন?

কেউ মানুক আর না মানুক সত্য এটাই, করোনার বিরুদ্ধে সার্বিক এবং সমন্বিত প্রস্তুতিতে আমাদের ঘাটতি আছে৷ ঘাটতি আছে প্রশাসনিক, চিকিকৎসাসহ সার্বিক প্রস্তুতিতে৷ এসবের জন্য নানা সময় যে বিভিন্ন কমিটি করা হয়েছে তাতে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি৷ টেকনিক্যাল কমিটিগুলোও ঠিকমতো হয়নি৷ এখানে সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠানকে রাখা প্রয়োজন৷ আর সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে করোনাকে মোকাবেলা করতে হবে৷

প্রকাশিত পত্রিকা- সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল, ১০ জুলাই, ২০২১

স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা : মন্ত্রী কি এ ব্যর্থতার জবাব দেবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top