শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ কি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে?

হাসান হামিদ

মিশ্র ধারায় ইদানীং শেয়ারবাজারে লেনদেন চললেও গত কয়েক সপ্তাহ টানা দর পতন হয়েছিল। এ ঘটনায় কেউ কেউ ভাবছেন, ক্রমশ ঝুঁকি বাড়ছে এই বাজারে। মোটা দাগে বলতে গেলে যখন দেখা গেল মাস দুয়েক আগেও লাগামহীনভাবে যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে, এখন সেসবের দর কেবল কমছে। আর বাড়ছে না। বিশেষ করে স্বল্প মূলধনের কোম্পানিগুলোর শেয়ার। আর এসব কোম্পানিতে যারা বিনিয়োগ করেছিলেন, তারা এখন ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ কারণে অনেকে টানা দর পতনের শেয়ার বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা এক সময় লোভে পড়ে ডান-বাম না ভেবে অনবরত স্টক কিনতে থাকে আর বাজার ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এটি যখন বাস্তবতার সীমারেখা ছাড়িয়ে যায়, তখন বাজার হয় অতি মূল্যায়িত। অতি মূল্যায়িত বাজার অবধারিতভাবে সামান্য অজুহাতে আপন প্রক্রিয়ায় তাকে সংশোধন করে নেয়, ইংরেজিতে যাকে বলে মার্কেট কারেকশন। এটি যতদিন চলতে থাকে, ততদিন নির্দয়ভাবে শেয়ারবাজারে দর পড়তে থাকে।

জানা কথা, শেয়ার মার্কেট হলো এমন একটি বাজার যেখানে ব্যবসায়ীরা ব্রোকার হাউজের মাধ্যমে বিভিন্ন দামের ও মানের শেয়ার ক্রয় বিক্রয় করেন। এসব শেয়ার নিবন্ধিত থাকে কোনো একটি স্টক এক্সচেঞ্জে। বাংলাদেশে স্টক এক্সচেঞ্জ দুইটি। একটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং অপরটি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ। এই দুই স্টক এক্সচেঞ্জই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় ট্রেডিং সিস্টেমে পরিচালিত হয়। শেয়ারবাজারে এ মাসের প্রথম সপ্তাহেও পতন হয়েছে। এই সময়ে শেয়ারবাজারের সবগুলো সূচক নেমেছে নিচের দিকে। পাশাপাশি কমেছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও লেনদেন। আর পতনের কারণে সপ্তাহটিতে বাজার মূলধন কমে যায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। তথ্য বলছে, উল্লেখিত সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস লেনদেন শুরুর আগে ডিএসইতে বাজার মূলধন ছিল ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৪৯৮ কোটি ৬০ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৫ টাকায়। আর ওই সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস লেনদেন শেষে বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৮ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ১৮৩ টাকায়। অর্থাৎ উল্লেখিত সপ্তাহের ব্যবধানে বিনিয়োগকারীরা মূলধন হারিয়েছে ১১ হাজার ৯৪০ কোটি ৪৮ লাখ ৬ হাজার ৪৯২ টাকা।

জানা গেছে, এ মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়েছে ৬ হাজার ৪৩০ কোটি ৪০ লাখ ৯২ হাজার ৮৫৭ টাকার। আর এর আগের সপ্তাহে লেনদেন হয়েছিল ৭ হাজার ৫৫০ কোটি ১৩ লাখ ২৫ হাজার ৬৫৩ টাকার। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন ১ হাজার ১১৯ কোটি ৭২ লাখ ৩২ হাজার ৭৯৬ টাকা কমেছে। উল্লেখিত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নিয়েছে মোট ৩৭৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ৯০টির, কমেছে ২৭০টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১৮টির শেয়ার ও ইউনিট দর। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৫৫.৬৪ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯০৬.৭২ পয়েন্টে। অপর সূচকগুলোর মধ্যে শরিয়াহ সূচক ১৭.২১ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৩৭.৬৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৪৬২.১৮ পয়েন্টে এবং ২ হাজার ৬০১.২৮ পয়েন্টে।

আবার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে লেনদেন হয়েছে ২০৮ কোটি ৬১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৬ টাকার। আর এর আগের সপ্তাহে লেনদেন হয়েছিল ২৫৮ কোটি ৯৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮২২ টাকার। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে সিএসইতে লেনদেন ৫০ কোটি ৩৫ লাখ ৮৫ হাজার ৯৭৬ টাকা কমেছে। এই সময়ে সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৩০.৯২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১৯৭.৯৮ পয়েন্টে। উল্লেখিত সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে লেনদেনে অংশ নিয়েছে ৩৪০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৮৭টির দর বেড়েছে, ২৪০টির কমেছে এবং ১৩টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইর অপর সূচকগুলোর মধ্যে সিএসসিএক্স ২৫৯.৮৯ পয়েন্ট, সিএসই-৩০ সূচক ৪৪৭.৭৬ পয়েন্ট, সিএসই-৫০ সূচক ১৯.১৮ পয়েন্ট এবং সিএসআই ১২.৯৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১২ হাজার ১৩২.৫৭ পয়েন্টে, ১৪ হাজার ৩৮.০৪ পয়েন্টে, ১ হাজার ৫০৫.৭২ পয়েন্টে এবং ১ হাজার ২৬২.৪৬ পয়েন্টে।

বাজার বিশ্লেষণ করে বলা যায়, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বাজার মূলধন হারিয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। এর আগের তিন সপ্তাহে ডিএসই’র বাজার মূলধন কমেছিল আরও ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ টানা চার সপ্তাহের দরপতনে ডিএসই মূলধন হারিয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন হল, কেন এমনটি ঘটছে? জানা গেছে, গত আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরোধ দেখা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ার বাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে প্রতিদিনের প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি দেয়। সেই সঙ্গে শেয়ার বাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ খতিয়ে দেখতে ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস পরিদর্শন শুরু করে। এভাবে বিএসইসি’র সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের দূরত্ব তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, অদাবিকৃত লভ্যাংশের অর্থ শেয়ার বাজারে স্থিতিশীলতায় গঠিত তহবিলে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এ ধরনের অর্থ তহবিলে জমা দিয়েছে, তা-ও ফেরত আনতে হবে। অপরদিকে বিএসইসি বলছে, এ টাকা বিনিয়োগকারীর। শেয়ার বাজারের তহবিলেই এ অর্থ স্থানান্তর হবে। এভাবে দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিরোধের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ বাড়ছে। এর ফলস্বরূপ দরপতন হচ্ছে শেয়ার বাজারে।

এই অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেছেন আশার কথা। তিনি বলেছেন, যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করা হয় সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বেশি মুনাফা প্রদানের নিশ্চয়তা রয়েছে। গত ৪ নভেম্বর যুক্তরাজ্যে স্থানীয় সময়ে সকাল ১০টায় বিএসইসি কর্তৃক অনুষ্ঠিত ‘বিএসইসি রোড শো: দা রাইজ অব বেঙ্গল টাইগার্স’ এর উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, আমাদের শেয়ারবাজার একটি ক্রমবর্ধমান এবং আমরা এর উপর অনেক জোর দিচ্ছি। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শেয়ারবাজার বড় ভূমিকা রাখছে। এখন আমরা শেয়ারবাজারে নতুন পণ্য যোগ করছি যাতে আগামী দিনে চালিকা শক্তি হিসেবে আরো ভূমিকা রাখতে পারে। বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা গত এক বছর তিন মাসের মধ্যে বাজার মূলধন ৪০ বিলিয়ন থেকে ৬৭ বিলিয়নে নিয়েছি। আর এই কারণেই আমরা এখনও শীর্ষদের শীর্ষে আছি। আমরা খুব শীঘ্রই উদীয়মান শেয়ারবাজারে চলে যাচ্ছি।

এসবই আসলে আশার কথা। আশাবাদী আমরা যারা, তারা অপেক্ষা করছি কী ঘটছে তা দেখার।

প্রকাশিত পত্রিকা- দৈনিক মানবকণ্ঠ, ২৬ নভেম্বর, ২০২১

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ কি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top