রাষ্ট্র কি একজন কবিকে ভালো রাখার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে পারে না?

হাসান হামিদ

বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি অসুস্থ। তিনি ভালো নেই। এ নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তাঁর সব দায়িত্ব নিতে চাইলে তাঁর আপত্তি আছে কিনা? তিনি এমন বিনয়ী; কাউকে বিরক্ত করতে চান না! তাঁর ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী নিজেই কত সমস্যায় আছেন, নানা সংকটে জর্জরিত এই দেশের কত সমস্যা। ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রীকে তিনি ত্যক্ত করতে চান না। এই মানুষটি আমাদের কবি হেলাল হাফিজ। ইতিহাসের উত্থাল সময়ে রচিত এক লাইন তাঁকে ইতিহাস করে তুলেছিল, ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গ্লুকোমায় আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিস ও স্নায়ু জটিলতায় ভুগছেন।

হেলাল হাফিজের বয়স চুয়াত্তর বছর। এ বয়সে নানাবিধ রোগে ভুগে কবি এখন অনেকটাই শয্যাশায়ী। এবারের জন্মদিনে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রায় একাকী সেখানে তাঁর ভালো লাগার কথা নয়, যদিও একাকীত্বকে সঙ্গী করেই কাটিয়েছেন কবি তাঁর বিগত বছরগুলো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে তিনি বেশ অসুস্থ। বছর দুয়েক আগে অসুস্থ হয়ে ল্যাবএইডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন দুই সপ্তাহ। এরপর থেকে অসুখ আর তাঁর পিছু ছাড়েনি। একটু সুস্থ হয়ে কিছুদিন গেলে আবার অসুস্থ হয়েছেন। দফায় দফায় অসুস্থ হয়ে তিনি একেবারে ভেঙ্গে পড়েছেন এখন। মনে ভয়ও ঢুকেছে। জীবনের এ পর্যায়ে আত্নহত্যার চিন্তাও করেছেন, এমন কথাও শুনেছি তাঁর মুখেই। আর বয়সও তো হয়েছে আসলে। কিন্তু তিনি যে একা! এই সময়ে তাঁর কত যত্ন প্রয়োজন। 

হাসপাতাল থেকে ২০ অক্টোবর রিলিজ পান কবি হেলাল হাফিজ। এখন তিনি আছেন আইনজীবী ও কবি ইসমত শিল্পীর বাসায়। কবির এই সময়ে তিনি সাধ্যের বাইরে এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন। ইসমত শিল্পী যেটি করেছেন এবং করছেন সেটি এই যুগে কেউ করে না। নিঃসন্দেহে তিনি মহৎ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসমত শিল্পী লিখেছেন, ‘‘২০ অক্টোবর কবি হেলাল হাফিজ হসপিটাল থেকে রিলিজ পান। সেই থেকে কবি আমার কাছে আছেন। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী নয়, সামর্থের বাইরেও চেষ্টা করছি তাঁর কেয়ার নিতে। আমার রুটিন ওয়ার্ক মাইনাস করতে হয়েছে। এটা সবাইকে জানানোর ইচ্ছে আমার হয়নি। কিন্তু দায়িত্ববোধ থেকে আমি আজ কবির বর্তমান অবস্থা এবং অবস্থান জানাচ্ছি। প্রচার নয়, এও আমার এক ধরনের দায়িত্ব মনে করছি। কারণ তিনি কখনো একটু ভালো বোধ করছেন কখনো ভেঙে পড়ছেন। মানসিকভাবে তিনি দুশ্চিন্তায় ভোগেন প্রায়ই। পরবর্তী সময়ে কী হবে এই ভেবে। আর শরীরের অবস্থা অনুযায়ী আমি নিজেও চিন্তামুক্ত নই। হেলাল হাফিজ দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। তাঁর সম্মানার্থে সঠিক নিরাপত্তা নিশ্চিৎ করা বিশেষ জরুরী। এটা খুব কঠিন বিষয় নয় বলে মনে হয়। প্রয়োজন সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ। কবি হেলাল হাফিজ সমস্ত জীবন অন্তর্মুখী স্বভাবের। এখনো তেমনই। তিনি সকলকে ভালোবাসা বিলিয়েছেন সারাজীবন। এখনও পর্যন্ত। কবির শুভানুধ্যায়ীরা কবির জন্য শুভকামনা রাখবেন। উনার কথা বলতে কষ্ট হয়। দূরে থেকে ভালোবেসে পাশে থাকুন সবাই’’।

কবি ইসমত শিল্পী আরেক জায়গায় লিখেছেন, ‘‘হাসপাতাল থেকে কবি হেলাল হাফিজকে আমার বাসায় আমি নিজের সিদ্ধান্তে এসেছি এটা যৌক্তিক ধারণা নয়। আলোচনার প্রেক্ষিতে সাময়িকভাবে আমার বাসায় থাকার কথা। কিন্তু আমি একা উনার সামগ্রিক দেখাশোনা করতে পারবো না তাই কবির জন্য একজন লোক চেয়েছিলাম। যারা হাসপাতালে ভর্তি থেকে শুরু করে উনার দেখাশোনা করার দায়িত্বে ছিলেন তাদের কাছে’’। এরপর তিনি লিখেছেন, ‘‘আমার কাছে কবি যতদিন আছে আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আমি দেখবো এটা আমার কথা। কিন্তু একটি ফাইনাল ব্যবস্থা হওয়া জরুরি। হাসপাতাল থেকে রিলিজের পর আমার কাছে রাখা হয়েছে কবি হেলাল হাফিজকে। আমি একা তাঁর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। উনার জন্যে কোনোভাবেই একা সবকিছু পারা সম্ভব না। চারবার ব্লাড টেস্ট, উনসুলিন দেওয়া,ঔষধ ও খাবার খাওয়ানো। এমনকি মানসিকভাবে ভালো রাখার চেষ্টাও। কতদিন সম্ভব? কবির জন্য পারমানেন্ট জায়গা করার কথা ছিল এক সপ্তাহের মধ্যে। তাদের পক্ষ থেকে আর কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি এতদিনে কবির জন্য একজন লোকও দেয়নি। কবির শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে ক্রমেই। কখনো প্রেসার কমে, বাড়ে। মাথা ঘুরায়। ঘুমের ভেতরে চিৎকার করে ওঠেন। সবথেকে বড় কথা মানসিক ভাবে তিনি দিশাহারা। কারণ তিনি নিজে চলতে পারেন না। এই অবস্থায় কোথায় যাবেন! খাওয়ার সময় কখনো কখনো চোখ ভিজে ওঠে। তাঁর কবিতা পড়ে শোনালেও এভাবে আড়ালে চোখ মোছেন। আমি দেখি, কিছুই বলার থাকে না। কেউ কেউ ফোন দিয়ে কবির কাছে জানতে চান, কী ভাবছেন এখন? আমি মনে করি, এটা একেবারেই অহেতুক প্রশ্ন। এই অবস্থায় কোনো মানুষের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা দেওয়া কখনো সম্ভব নয়; এবং এ ধরনের প্রশ্ন দায়িত্ব এড়ানোর নামান্তর। সকলেই যেন এড়িয়ে যাচ্ছেন। সবাই ভীষণ ব্যস্ত। এই অবস্থায় আমিও ভীষণ অসহায় বোধ করছি। এবং আশ্চর্য হচ্ছি এই ভেবে যে, অনেকের কাছে আমি নিজেই কথা বলেছি, কবির জন্য একটি সুস্থ ও সুষ্ঠ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। তার কোনো উত্তর এখনো পর্যন্ত আসেনি। আমি ভীষণ মর্মাহত এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করছি। কোনো উপায় দেখছি না। এখন এখানে বাধ্য হয়ে লিখলাম। বিষয়টি অন্যভাবে নেবেন না। এভাবে তো চলতে পারে না। কবি হেলাল হাফিজ কোনো সাধারণ মানুষ না। তিনি এই দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। সবাইকে তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানানো দরকার মনে হলো’’।

কবি ইসমত শিল্পী তাঁর সাধ্যমতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ একজন কবির পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটাকে ঠিক পাশে দাঁড়ানো বলে না, এরচেয়ে অনেক বেশিকিছু। কিন্তু তাঁর একার পক্ষে আসলে এভাবে কতদিন সম্ভব? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর আগে কবি হেলাল হাফিজের চিকিৎসার ভার নিয়েছিলেন। আশা করব, খুব তাড়াতাড়ি যাবতীয় প্রয়োজনীয় সব করতে এবারও তিনি এগিয়ে আসবেন। রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি এই সময়ে যেন স্বস্তিতে থাকেন। 

কবি হেলাল হাফিজ এ বছর কয়েকবার অসুস্থ হন। সর্বশেষ অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। এর সপ্তাহ খানেক আগে রাজধানীর বারডেম হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরেছিলেন শাহবাগের একটি হোটেলে। গত কয়েক বছর ধরে যেখানে থাকছেন কবি। বারডেমে ভর্তি হয়েছিলেন ১ সেপ্টেম্বর, হাসপাতালের ৮৪১ নম্বর কেবিনে। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ না হয়েই হাসপাতাল ছেড়ে যান তিনি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বারডেম হাসপাতালে একাকী তিন রাত থেকেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কবির জীবনে একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা ভর করেছে। হাসপাতালে কবিকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করার মতো কেউ ছিল না। হাসপাতালে কবিকে সেবা দিয়েছেন কেবল নার্সরা। সংবাদ মাধ্যমে কবি হেলাল হাফিজ এ বিষয়ে বলেছিলেন, ‘‘হাসপাতালে থাকতে ভালো লাগছিল না, তাই চলে এসেছি। আমি এখনও পুরোপুরি সুস্থ হইনি’’। এর আগে, গত ১৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কবি হেলাল হাফিজকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছিল। আবার ২০২১ সালের আগস্টেও কবি যখন অসুস্থ হন, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় তাঁকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়েছিল। কবির এ সময়ে আবারো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এগিয়ে আসবেন বলে আশা করি। 

কবি হেলাল হাফিজ একা মানুষ। ছোটবেলায় তাঁর মা মারা যান। কিছুদিন পর বাবা আবার বিয়ে করেন। দুই ঘর মিলিয়ে তাঁর চার ভাই, তিন বোন। সংসার করেননি। কবির দীর্ঘ সময় কেটেছে ঢাকার সেগুনবাগিচায় অবস্থিত কর্ণফুলী হোটেলে। টানা নয় বছর যাবত এই হোটেলে তিনি থেকেছেন। ২০২০ সালের মার্চে করোনা মহামারি আকার ধারণ করলে সরকার লকডাউন দেয়। এ সময় কবি বিপাকে পড়েন। কারণ তখন হোটেল থেকে সব বর্ডার চলে যায়। কিন্তু হেলাল হাফিজ কোথায় খাবেন, কোথায় থাকবেন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আবার তিনি বয়স্ক একজন মানুষ। তাঁর ঝুঁকি অনেক। সেই সময়ে কবির বড় ভাই তাঁর পাশে দাঁড়ান। কবির ভাইয়ের মেয়ে রিনি এসে গাড়ি দিয়ে হোটেল থেকে নিয়ে যায়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় কবি হেলাল হাফিজ প্রায় পনেরো মাস ভাইয়ের বাসায় ছিলেন। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেখান থেকে এসে উঠেন শাহবাগের এক হোটেলে। 

কবি হেলাল হাফিজ বাংলা সাহিত্যের সৌভাগ্যবান একজন। তাঁর কবিতার সংখ্যা একশোর কম। পৃথিবীর আর কোনো কবি এত অল্প লিখে এত জনপ্রিয়তা পেয়েছেন কিনা আমার জানা নেই। তাঁর উত্থানটাও এক বিশেষ সময়ে। যতদূর জানি, একাত্তরের পঁচিশে মার্চ কালরাতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান হেলাল হাফিজ। সেই রাতে ফজলুল হক হলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে সেখানেই থেকে যান। রাতে নিজের হল ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক) থাকার কথা ছিল তাঁর। আর সেখানে থাকলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার হতেন হেলাল হাফিজ। এরপর ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেওয়ার পর ইকবাল হলে গিয়ে দেখেন চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, লাশ আর লাশ। হলের গেট দিয়ে বেরুতেই কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে দেখা। তাকে জীবিত দেখে উচ্ছ্বসিত আবেগে বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকলেন নির্মলেন্দু গুণ। ক্র্যাকডাউনে হেলাল হাফিজের কী পরিণতি ঘটেছে তা জানার জন্য সেদিন আজিমপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন নির্মলেন্দু গুণ। পরে নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের দিকে আশ্রয়ের জন্য দুজনে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দেন। 

বেদনার চাষাবাদ করা বেনোজলে ভেসে না-যাওয়া কবি হেলাল হাফিজ বাংলা ভাষার সর্বকালের জনপ্রিয় কবিদের অন্যতম। তাঁর কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ ১৯৮৬ সালে প্রকাশ হওয়ার পর ৩৩টিরও বেশি সংস্করণ প্রকাশ হয়েছে বলে জানি। একজন কবি কিংবা লেখককে শাসন করে সম্ভবত তাঁর লেখা। আর এ কারণে নিজের সৃষ্টির শাসনে একজন কবি যে জীবনকে যাপন করেন, সেটি হয় যুগপৎ বন্দি ও মুক্ত। কবি হেলাল হাফিজের জন্য আমাদের ভীষণ মন খারাপ। সেইসাথে এ কথা ভেবেও বিচলিত হচ্ছি, যে জীবন রাতের পর রাত নিদ্রাহীন চোখ নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করে যায়, সমৃদ্ধ করে চলে দেশের ভাষা আর সংস্কৃতি; শেষ বয়সে রাষ্ট্র কতটা পাশে দাঁড়ায়? যতটা দাঁড়ায় কখনো কোনো লেখকের ক্ষেত্রে, সেটা কি যথেষ্ট হয়? অন্য অনেকের চেয়ে হেলাল হাফিজ আলাদা, যেহেতু তাঁর সংসার নেই। তাঁর এখন প্রয়োজন শারীরিক যত্ন, মানসিক প্রশান্তি। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য লোক দরকার, দরকার নার্স। আমরা চাই রাষ্ট্র কবির পাশে দাঁড়াক। তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হোক, যেন জীবনের এই বেলায় তিনি স্বস্তি পান।

রাষ্ট্র কি একজন কবিকে ভালো রাখার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে পারে না?

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Scroll to top