রানি ভবানী দিঘি কাণ্ড : নেপথ্যের কুশীলবরা কি পার পেয়ে যাবেন?

হাসান হামিদ

নাটোরের ঐতিহাসিক রানি ভবানীর বাড়ি ঘুরে এসেছিলাম অর্ধ যুগ আগে। কয়েক দিন আগে পত্রিকার একটি খবরে চোখ আটকে গেল। প্রকাশিত সংবাদে এসেছে, রানি ভবানী দিঘিটিকে স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে একটি বানোয়াট চিঠির ওপর ভিত্তি করে! মূলত নাটোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার যোগসাজশে যে কাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা বিস্ময়কর! জানতে পেরেছি, ভুয়া চিঠি ইস্যু করে শহরের লালবাজার এলাকায় রানী ভবানী খননকৃত ৪২ একর আয়তনের জয়কালী দিঘির স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয় নাটোর আধুনিক মৎস্য চাষ প্রকল্প লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী গোলাম নবীর নামে। ভয়ানক ব্যাপার হলো, বিষয়টি জানার পর দুদকসহ সংশ্লিষ্টরা দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত করলেও কার্যত কিছু হয়নি। এর নেপথ্যের কুশীলবরা কি তবে ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থাকবেন?

দীঘি কাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত বলার আগে রানি ভবানীকে নিয়ে বলার লোভ সামলাতে পারছি না। আঠারো শতকে ভারতের বেশিরভাগ মহিলারা দিনযাপন করতেন পর্দার আড়ালে, এ আমরা জানি। সেই সময় রানি ভবানী রাজশাহীর জমিদার ছিলেন, বাংলায় প্রথম মহিলা জমিদার তিনি। রানি ভবানী জন্মেছিলেন ১৭১৬ সালে বগুড়া জেলার তৎকালীন আদমদিঘী থানাধীন ছাতিয়ান গ্ৰামে। অল্প বয়সে তার বিয়ে হয় নাটোরের জমিদার রমাকান্তের সঙ্গে। ইতিহাস বলে, নাটোরের জমিদার জঙ্গলে শিকার করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তার সাথে দেখা হয় আরেক জমিদারকন্যা ভবানীর সাথে। দেখেই তার প্রেমে পড়েন যুবক জমিদার রমাকান্ত। তিনি মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করে বসেন যে, যেভাবেই হোক এই মেয়েকে তিনি বিয়ে করবেনই। ভবানীর বাবা ছিলেন ছোট এক জমিদার, প্রতিপত্তি রমাকান্তের মতো ছিল না তার। ফলে এই বিয়েতে আর নারাজি হলে না তিনি। যোগ্য পাত্র। সম্মতি দিয়ে দিলেন। বিয়ে হয়ে গেল। তবে বিয়ের আগে রমাকান্তের কাছে ভবানী তিনটি শর্ত রেখেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। এক, বিয়ের পর তাকে একবছর পিতৃগৃহে থাকতে দিতে হবে। দুই, এলাকার দরিদ্র মানুষদের জমি দান করতে হবে। তিন, বাবার জমিদারি ছাতিয়ানা থেকে নাটোর অবধি রাস্তা বানিয়ে তা লালসালু দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, যার উপর দিয়ে তিনি শ্বশুরবাড়ি যাবেন। জমিদার রমাকান্ত এই তিনটি শর্ত‌ই মেনে নিয়েছিলেন।

রমাকান্ত এতবড় জমিদারি কীভাবে পেয়েছিলেন? জানা কথা, নবাব মুর্শিদকুলী খানের আমলে রাজশাহী জমিদারির পত্তন হয়। ১৭০৬ সালে তহসিলদারপুত্র রামজীবন রাজশাহীতে একটি জমিদারির বন্দোবস্ত করাতে সক্ষম হন নবাবকে বলে কয়ে। রামজীবনের দক্ষতা এবং বিচক্ষণতার জন‍্য একের পর এক অংশ রাজশাহী জমিদারির সাথে যুক্ত হতে থাকে। এভাবে ধীরে ধীরে রামজীবন এক বিশাল এলাকার জমিদার হয়ে ওঠেন। ১৭৩০ সালে রামজীবন‌ পরলোক গমন করেন। রামজীবনের মৃত‍্যুর আগেই তিনি রমাকান্তকে দত্তক নেন এবং সমস্ত জমিদারি তার নামে লিখে দিয়ে যান। মাত্র ১৮ বছর বয়সে রামকান্ত রাজশাহীর জমিদারি লাভ করেন।

রমাকান্ত জমিদার হলেও তার মনোযোগ বেশি ছিল ধর্মেকর্মে। বিয়ের পর রাজশাহীর জমিদারি সামলাতেন রানি ভবানী। এর মাঝেই রানি ভবানীর ঘরে তিন সন্তান জন্ম নেয়, দুইজ ছেলে আর এক মেয়ে। কিন্তু দুই পুত্র অতি শৈশবেই মারা যায়, এক কন‍্যা তারাসুন্দরী কেবল বেঁচে যায়। এই কন্যা ছিল অতি রূপবতী। কেউ কেউ বলেন, তারাসুন্দরীর রূপে মুগ্ধ হয়ে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। ১৭৪৮ সালে রমাকান্তের জীবনাবসান ঘটে। তার মৃত্যুর পর জমিদারির সমুদয় কর্তৃত্বের অধিকারী হন রানি ভবানী। বিশাল সম্পত্তির মালিকানা তার হলেও তিনি অতি অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। প্রজাহিতৈষী মনোভাবের জন‍্য তিনি প্রজাদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন।

রানি ভবানীর স্মৃতিবিজড়িত মূল ভবনটিই এখনকার ঐতিহ্যবাহী নাটোর রাজবাড়ি। গোটা রাজবাড়িতে ছোট-বড় ৮টি ভবন, ২টি গভীর পুকুর ও ৫টি ছোট পুকুর আছে। প্রবেশমুখে রয়েছে বিশাল একটি পুকুর, সেই পুকুরের শানবাঁধানো ঘাট দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। জলটুঙ্গি, তারকেশ্বর, গোপীনাথ, আনন্দ, ও মহাল নামে রাজবাড়ীর ছোট পুকুরগুলির নাম। রাজবাড়ি ঘিরে আছে দুই স্তরের বেড়চৌকি। জানা যায়, এই বেড়চৌকি রাজবাড়িতে বহিশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করত। অপরূপ কারুকার্যখচিত বিশাল এই রাজবাড়ির মোট আয়তন ১২০ একর।

পুরো রাজবাড়ি ঘিরে আছে বিশাল সব গাছ। রয়েছে নানা জাতের ফুলগাছ। পাশেই নবনির্মিত কমিউনিটি সেন্টার। কমিউনিটি সেন্টার ধরে সামনে গেলে তারকেশ্বর মন্দির। আরেকটু সামনে এগিয়ে ডান দিকে বিশাল মাঠ। মাঠের বিশাল প্রান্তরে দাঁড়ালেই চোখে পড়বে রাজবাড়ির একতলা ভবনটি। এই অংশের নাম ছোট তরফ। এর ঠিক উল্টো দিকে বড় তরফ। যমজ প্রায় বড় তরফের সামনে রয়েছে বিশাল পরিখা ও পুকুর। সামান্য দূরেই রানি মহলটিতে রানি ভবানী বাস করতেন। এখন রানি মহল আছে নামমাত্র। শুধু সাইনবোর্ডে লেখা দেখে চেনা যায়। এখানে একটি অতিথিশালা আছে, নাম মাত্র। আর রাজবাড়ির আঙিনায় রয়েছে বিশাল বিশাল আটটি শিবমন্দির। মন্দিরগুলোতে এখনো রীতি মেনে নিয়মিত পূজা-অর্চনা করা হয়। দৃষ্টিনন্দন এই মন্দিরগুলো আপনাকে মুগ্ধ করবেই। মন্দিরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে প্রাচীন টেরাকোটার শিল্পকর্ম। মন্দিরকে ঘিরে আছে একটি শিবমূর্তি, ফণা তোলা সাপের মূর্তি, একজন বাউলের মূর্তিসহ নানা রকমের শৈল্পিক কারুকাজ। ওপরে ওঠার জন্য প্রতিটি ভবনের পাশেই রয়েছে লোহার তৈরি ঘোরানো সিঁড়ি।

রানি ভবানী বাংলায় শত শত মন্দির, চিকিৎসালয়, সরাইখানা, অতিথিশালা নির্মাণ করেন। প্রজাদের জলের কষ্ট দূর করার জন‍্য তিনি অসংখ‍্য পুকুর ও দীঘি খনন করেন। ১৭১৭ সালে রানি ভবানী জয়কালী মন্দির ও দিঘিটি তৈরি করেন। এই দীঘি খননের উদ্দেশ্য ছিল এর জলে দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন, পূজার ফুল, পাতা, দুর্ব্বা ভাসানো এবং দীঘির মাছ অতিথিদের আহারে ব্যবহার করা। পরবর্তী সময়ে অনেক অনেক বছর পর রাজস্ব বিভাগের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীর যোগসাজশে আইন বহির্ভূতভাবে হাল রেকর্ডে খাস খতিয়ানভুক্ত করে এই  দিঘিটি।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ১৯৯৬ সালে অকৃষি জমি হিসাবে মাছ চাষের জন্য ১০ বছরের জন্য দিঘিটি ইজারা নেন গোলাম নবী। পরে ইজারার মেয়াদ শেষ না হতেই বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে একইভাবে দিঘিটি স্থায়ী বন্দোবস্ত নেন তিনি। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে নাটোরের জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, গোলাম নবীর আবেদনে সর্বশেষ সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী আব্দুস সাত্তার অকৃষি খাসজমি ইজারার বিদ্যমান নীতিমালার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নাটোরের প্রশাসককে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। কিন্তু এই চিঠি জেলা প্রশাসককে না দিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে রহস্যজনকভাবে ২০০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জয়কালী দিঘি গোলাম নবীকে স্থায়ী ইজারা প্রদানের জন্য ডাকযোগে রেজিস্ট্রি চিঠি পাঠানো হয়, যা ছিল জাল। চিঠিতে আরও বলা হয়, কোনও প্রকার যাচাই বাছাই না করে নাটোরের জয়কালী দিঘি জাল চিঠির উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক প্রভাবে ও চাপে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ইজারা দেন ওই সময়ের জেলা প্রশাসক। বোঝাই যাচ্ছে, নাটোর জেলা প্রশাসন জলমহাল নীতিমালা লঙ্ঘন করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিনা রাজস্বে চুক্তিপত্রের পরিবর্তে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের নীতিমালা অনুযায়ী দলিল (কবুলিয়ত) সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করে দিয়েছে। এতে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি বেহাতের যে অপচেষ্টা করা হয়েছে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের বিচার না হলে, দেশজুড়ে আরও যে এমন ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কী?

প্রকাশিত পত্রিকা-  দেশবার্তা, ২৯ ডিসেম্বর ২০২১

রানি ভবানী দিঘি কাণ্ড : নেপথ্যের কুশীলবরা কি পার পেয়ে যাবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top