মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কা: সামাল দিতে সরকার কতটা প্রস্তুত?

ব্যাংক অব ইংল্যান্ড কয়েক দিন আগে (১৭ নভেম্বর) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে জানানো হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বিগত দশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। গত মাসে সেখানে জ্বালানির দর ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। আর এটিই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি গত ত্রিশ বছরের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় দেশগুলোসহ অনেক দেশেই অবস্থা এমন। আর বাংলাদেশের শিল্পপণ্যের বিরাট একটা অংশ কিন্তু বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। যেহেতু বিশ্ব অর্থনীতির সাথে এ দেশের অর্থনীতি এখন পুরোপুরি সম্পৃক্ত, সুতরাং বিশ্ব বাজারের হাওয়া এ দেশের অর্থনীতির পালেও লাগবে, এটিই স্বাভাবিক। ফলাফল সবকিছুর দাম বর্তমানে বাড়তির দিকে। চাহিদা পুনরুদ্ধার, নজিরবিহীন শিপিং চার্জ এবং সরবরাহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে বেশিরভাগ পণ্যের দাম দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে।

গত এক মাসে আমাদের বাংলাদেশে আসলে কী ঘটেছে? সব জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে ভয়াবহভাবে। হঠাৎ এই দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যা যোগ হবে মূল্যস্ফীতিতে। এটাই আশঙ্কার ব্যাপার। মূল্যস্ফীতি নিয়ে আমাদেরকে এখনই উদ্বিগ্ন হতে হবে। এর কারণ এটি ইতোমধ্যে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সামনে আরও বাড়বে যদিনা তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রিত মূল্য নির্ধারণ না করা হয়। এই মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সরকার কতটা প্রস্তুত সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মূল্যস্ফীতি আসলে কী? মূল্যস্ফীতি বলতে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোন দেশের দ্রব্য বা সেবার মূল্যের স্থায়ী একটা উর্ধ্বগতি বুঝায়। সাধারণভাবেই মানুষ নিত্যদিন যে দ্রব্যের প্রয়োজন বোধ করে তার দাম নিয়েই তার চিন্তা থাকে। আর তাই মূল্যস্ফীতি মানে অর্থনীতির সব দ্রব্যের দামের পরিবর্তনকেই বুঝায় না; বরং জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের একটি ‘বাস্কেট’ বা গুচ্ছের (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র ২৬৪টার মত পণ্যের একটা বাস্কেট আছে) গড় দাম একটি নির্দিষ্ট সময়ে কতটুকু পরিবর্তিত হল তাই নির্দেশ করে। এই সময় হতে পারে প্রতিদিনকার ভিত্তিতে, মাসিক অথবা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে। এমনকি এটি ষাম্মাষিক, বার্ষিক কিংবা পয়েন্ট টু পয়েন্ট সময়ের ভিত্তিতে হতে পারে। দেখা গেছে গত দুই দশক সাফল্যের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে আমাদের দেশ। এর হার ৫ বা সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে এই সময়টায়। এখন হঠাৎ করে বাংলাদেশে গত কয়েক মাস ধরে টানা মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। ফলে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে।

লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কিছুদিন আগে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বিপর্যয় নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছিল। আমরা কিন্তু সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে চীন ও ভারত থেকে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এ দুই দেশেই মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে। ভারতে গত তিন মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ শতাংশে উঠেছে। ভারত থেকে পণ্য আমদানির ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে এবার একটু নজর দেব।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৫ পয়েন্ট বেড়ে ৫ দশমিক ৫৯ হয়েছে, যেটি আগস্টে ৫ দশমিক ৫৪ ছিল। গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশে দাঁড়ানোর অর্থ হলো গত বছরের সেপ্টেম্বরে যে পণ্যটি ১০০ টাকায় কেনা যেত, সেটি কিনতে এ বছরের সেপ্টেম্বরে লেগেছে ১০৫ টাকা ৫৯ পয়সা। খাদ্য নয়, এমন পণ্যের মূল্যস্ফীতির হার সেপ্টেম্বরে ৬ পয়েন্ট বেড়ে ৬ দশমিক ১৯ হয়েছে। আগস্টে এটি ৬ দশমিক ১৩ ছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৫ পয়েন্ট বেড়ে ৫ দশমিক ২১ হয়েছে, যেটি আগস্টে ৫ দশমিক ১৬ ছিলো। বিবিএস একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চাল, ডিম, গম, রসুন, পিঁয়াজ, আদা ও হলুদের দাম গত মাসে বেড়েছে। গ্রামীণ অঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগস্টের ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ হয়েছে। একইভাবে, খাদ্য নয়- এমন পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ হয়েছে। তবে শহরাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগস্টের ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। শহরাঞ্চলে খাদ্য নয়, এমন পণ্যের মূল্যস্ফীতির হার আগস্টের ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ হয়েছে। গত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ৫ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে সামান্য পরিমাণে বেশি, ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হারে স্থিতিশীল ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশেও চাল, ডাল, তেল, আটাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে আর্থসামাজিক সকল ক্ষেত্রে।

সামনের দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। দেশের হালনাগাদ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি করা এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে চারটি প্রধান ঝুঁকির কথা বলছে তারা। এগুলো হলো- বৈশ্বিক খাতে প্রত্যাশার চেয়ে পুনরুদ্ধারের গতি কম; বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির হারে ঊর্ধ্বগতি; শ্রমবাজারে কর্মের অভাব এবং পণ্য পরিবহণ খরচ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যসহ খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী। তবে সম্প্রতি খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেশি বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্য এ হার সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে মুদ্রানীতির দিক থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

করোনার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ও আর্থিক কাঠামোর করুণ পরিণতির ব্যাপারে বিশ্বের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, করোনার অভিঘাতে সৃষ্ট বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা যে কোনো আর্থিক মন্দার চেয়ে খারাপ হবে। করোনার প্রকোপে বিশ্ব অর্থনীতি যেমন সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে, একইভাবে দেশের অর্থনীতিও নেতিবাচক পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে, বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের অনেক কিছুই করার আছে।  এই মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সরকারকে প্রস্তুত থাকতে হবে ভালো মত। প্রথমে সরকার যেটা করতে পারে, সেটা হচ্ছে গরিব জনগণকে সহায়তা প্রদান। এর কারণ করোনা মহামারির কারণে আরো পনেরো শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমায় প্রবেশ করেছে। এদের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করছে। তারা কিছুতেই আস্থা রাখতে পারছে না। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরিদ্র লোকজনের আয় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায় মূল্যস্ফীতির কারণে। কারণ মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে প্রকৃত আয়টা হিসাব করতে হয়। দরিদ্র মানুষ যেহেতু আয়ের প্রায় সম্পূর্ণ অর্থটাই খাবারে ব্যয় করে, তাই তার প্রকৃত আয় অন্যদের তুলনায় অনেক কম। আর মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধে সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। আবার এটা যেহেতু বেসরকারি খাতের বিষয়, তাই কাজটা সহজ নয়। এ জন্য সরকারকে কাজ করতে হবে কৌশলে, বাড়াতে হবে মনিটরিং। বাজারে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা ব্যাহত করে যারা সিন্ডিকেট ট্রেডিং করে, তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে আগামী দিনে কী ঘটতে যাচ্ছে, বাজারের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কেননা বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কেবল আর এক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এই ব্যাপারটি আজকের দিনে প্রবাহিত হয় এক দেশ থেকে অন্য দেশেগুলোতেও। তাই এর চ্যালেঞ্জ আমাদের মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারকেও প্রস্তুতি নিতে হবে, থাকতে হবে সতর্ক।

প্রকাশিত পত্রিকা- সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল, ২৬ নভেম্বর ২০২১

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কা: সামাল দিতে সরকার কতটা প্রস্তুত?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top