মা

ফোনের ওপাশে আম্মা কাঁপা গলায় বললেন, আচ্ছা, ঈদের পরদিনই তাহলে আয়।

এই প্রথম ঈদে আমি বাড়ি যেতে পারছি না। ঈদে ঢাকায় থাকছি। আম্মাকে ছাড়া ঈদ। ভাবতে পারি না। পরিকল্পনা ছিল ঈদে যাব এবং তারপর আম্মাকেসহ ঢাকায় ফিরব। একটা বিশেষ কারণে ঈদের আগে যাচ্ছি না। আম্মাই বললেন, ঈদের আগে দরকার নেই। ঈদের পরদিন যেন যাই এবং তারপর আম্মাকে নিয়ে আসি।

আম্মার সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম, আমি তখন আমার অফিসে। ফোন রাখার পর বারবার ছোটবেলার ঈদের কথা মনে হচ্ছিল। কথাগুলো খুব বেশি দিন আগের নয়। এক যুগেরও কম সময়ে আমরা ছেলেরা হাজার বছরের ব্যস্ততা লালন করে ফেলি। আর সেটার জন্য কষ্ট কি আমাদেরও কম হয়?
আমার আব্বা আমাদের গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। আব্বা যখন মারা যান, আমরা ভাইবোনেরা সবাই তখন ছোট ছোট। আমার বয়স মাত্র চার বছর। আমাদের এতগুলো ভাই-বোন, আম্মা আমাদের আগলে রেখে বড় করেছেন। আমাদের পড়িয়েছেন। তাঁর ওপর দিয়ে কী ঝড় গেছে, তিনি এতসব কীভাবে সামাল দিয়েছেন, তা ভাবলে এখন অবাক হই। আম্মা এত কিছু কীভাবে করতেন আমাদের জন্য!

আমি সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের এক অজপাড়া গ্রাম আবিদনগরে জন্মেছি। আমার জন্মের দিন আব্বা অসুস্থ ছিলেন। আমি যখন নামলাম এই পৃথিবী নামক গ্রহে, আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমার ছোট ছোট হাত, ছোট চোখ, চোখের পাতা। আর তারপর সেই ছোট আর শক্তিহীন হাতকে আম্মা শিখিয়েছেন কীভাবে ধরতে হবে পৃথিবীর আঙুল! আম্মা আমাদের কোনো অভাব কখনই বুঝতে দেননি। এতগুলো ছেলেমেয়ের এত এত জিনিসপত্র, জামা-জুতো, বই-খাতা কোনো কিছুর অভাব রাখতেন না। তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি আম্মার তাতে কত কষ্ট করতে হতো। আমাদের গ্রামে বড় গৃহস্থ ছিল। আর সবকিছু তদারকি আম্মাই একাই করতেন। কাজের লোক সামাল দেওয়া, এত জমির খোঁজখবর রাখা, চাট্টিখানি কথা নয়। এ কারণে আম্মাকে বরাবর আমার বুদ্ধিজীবী মনে হয়।
ছোটবেলায় দেখতাম, ঈদের আগে সবার, বিশেষ করে ছোটদের ঈদ নিয়ে সে কী উত্তেজনা! আম্মা যখন পিঠা বানাতেন, আমরা ভাই-বোনেরা গোল হয়ে বসতাম। আশপাশের ঘর থেকে পিঠা আসত, আমরাও অন্যদের দিয়ে আসতাম। আর ঈদ উপলক্ষে দুই সপ্তাহ আমরা বইয়ের ধারে কাছেও যেতাম না। ঈদের দিন খুব ভোরে গোসল করতে আমরা দল বেঁধে নদীতে ঝাঁপ দিতাম। সেই অপার আনন্দ এখনকার ঈদে খুঁজে পাই না তেমন।
ছোটবেলায় আমার একবার খুব জ্বর হলো। তখন ক্লাস থ্রি-তে পড়ি। আমি জ্বর হলে কিছু খেতে পারতাম না। এ কারণে আম্মাও খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিতেন। আমি তখনই বুঝলাম, আমার জ্বর আর আম্মার জ্বরে কোনো ব্যবধান নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তাম, আমি কোচিং-এ পড়িয়ে, টিউশনির টাকা জমিয়ে ঈদে সবার জন্য কিছু না কিছু নিতাম। মাঝে মাঝে আম্মার জন্য দুইটা শাড়ি কিনলে, আম্মা বলতেন—দুইটা কেন? কিন্তু আম্মা কী যে খুশি হতেন।
আমি এখন চোখ বন্ধ করে আছি, ঈদের পরদিনটা যদি আগামীকাল হতো!

প্রকাশিত পত্রিকা- দৈনিক প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট ২০১৭

মা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top