ভালোবাসা

প্রায় কুড়ি বছর পর আবারও রুদ্রের দেওয়া কবিতার বইটি পুরনো শেলফ থেকে নামায় সিমি। বইয়ের ভাঁজে তিনটি মরে যাওয়া পিঁপড়া, মার্কার দিয়ে দু’ জায়গায় দাগানো আর ছিন্নভিন্ন ডায়েরির একটি পৃষ্ঠা আছে। এই পৃষ্ঠার লেখাগুলোতে অনেক দিন চোখ বোলায়নি সে। কাগজ খুলে সিমি আজ পড়তে শুরু করে…

১০ জুলাই, ১৯৭১

মধ্যরাত

ইচ্ছে করলে যখন তখন কয়েকটা ডিজিট ডায়াল করে কথা বলতে পারি তোমার সাথে। (আমরা জেরিনদের বাসায় লুকিয়ে আছি কিছুদিন। এখানে টেলিফোন আছে।) কিন্তু সেটা এই মুহূর্তে ইচ্ছে করছে না। তবে আমি যে অবস্থায় এখন আছি, চিঠি লেখাটাও বড্ড বেমানান; তবুও লিখছি এবং তুমি ইতোমধ্যে তিন লাইন পড়েছ বলে আগবাড়িয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাখছি।

সময়ের হিসেবে এখন রাত গভীর। ঘুমন্ত ঢাকা শহরকে ঢেকে আছে নরম কোমল গুমট অন্ধকার, তার ওপর শীতের রাত। নিঝুম নির্জনতা চিরে রাজপথে কখনো কখনো ভেসে আসছে কিছু অদ্ভুত ভয়ঙ্কর শব্দ। আর আমি জেগে আছি একলা জাগার তিন প্রহরে। তুমি কি ভালো আছো? যদি ভালো থাকো, তাহলে জিজ্ঞেস করছি, কী করে আছো? আমি তো পারি না– দীর্ঘ দীর্ঘ দিন পারি না। তুমি আমার জন্য একবার কেঁদেছিলে, মনে আছে? তোমার সেই কান্নার কথা মনে হলেই উদাসীন এই আমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় আফসোসের হাওয়া। পা পা করে একটি কষ্ট উঠে আসে আমার জীবনে, দিনের শরীর থেকে বাদ পড়ে যায় রোদের ভূমিকা। স্বপ্নের গাল বেয়ে ঝরে পড়া অশ্রুকে সামলাই, আমারও ইচ্ছে হয় কাঁদি, ইচ্ছে হয় ফালি ফালি করে কেটে ফেলি ভালোবাসার শরীর, ইচ্ছে হয় খুলে দেখাই স্বপ্ন আর আগামীকালের হাড্ডিসার দেহ। তোমাকে বলতে পারিনি– আমিও বেশ ভালো ছিলাম না গো। হ্যাঁ, নেই নেই করা দুঃস্বপ্ন উন্মাদের মতো ছুটে আসতো। তোমার সাথে কথা বলতে পারিনি যে সময়গুলোতে– সেই রোদহীন শীতার্ত সকালগুলো আমাকে জমিয়ে কেমন বরফ বানিয়ে রাখতো, কেমন নিঃস্পৃহ করে রাখতো আপাদমস্তক। অবুঝ ইচ্ছেগুলো ভুল স্বপ্নের গা ছুঁয়ে দিতো বারবার। তোমার সাথে কথা না বললে অক্টোপাসের মতো স্মৃতির হাতগুলো আমার কণ্ঠ চেপে ধরে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

নিঃশব্দের ঘোর লাগা আমার একেকটা দিন বড় একা লাগে, মন খারাপের মেঘলা দিনে বড় বেশি ইচ্ছে হয় সব ছেড়ে-ছুড়ে তোমার কাছে চলে যাই– গিয়ে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কাঁদি। কিন্তু এইটুকুন দূরত্বকে আমার যোজন যোজন দূর মনে হয়। আমার আরা বাস্তবতার ফোকর গলিয়ে তোমার কাছে যাওয়া হয় না, রিকশার হুড ফেলে তোমার সাথে বৃষ্টিতে ভেজা হয় না।

এই পর্যন্ত পড়ে সিমি থামে। পৃষ্ঠার বাকি অংশটুকু ছেঁড়া। অপর পৃষ্ঠায় লেখা

বোধের বন্দর ডুবে গেছে। জেগে আছে বিস্তীর্ণ রাত। নদীর ঢেউ খাওয়া জল, অবাধ্য বাতাস; অথবা তুমি আর আমি মিলে সব জারুলের ফুল। ক্রমাগত বিরুদ্ধ বাতাস ঠেলে আমার পথ চলা। প্রতিদিন অপারেশনে যাওয়ার আগে তোমার মুখটি মনে করি। দেশ স্বাধীন হয়ে গেলে আমি নিয়ে আসবো তোমায় আমার কাছে। আমি জানি আমরা পারবো। তারপরও আশেপাশের অনেক প্রশ্ন শুনে কাতর হই। রাশি রাশি প্রশ্নের মানে বুঝতে না বুঝতেই আমি চোখের বৃষ্টিতে ভিজি। আকাশ চুইয়ে পড়া জোছনার আলো তখন আমার চোখের জলে আলো ছায়া খেলা করে।

এইডায়েরি লেখার পরের সপ্তাহে রুদ্রকে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে যায়। রুদ্রকে আরকোথাও দেখা যায়নি কখনো। ডায়েরিটি রুদ্রর এক বন্ধু বিশ বছর আগে দিয়ে যায়সিমির বাসায়।

প্রকাশিত পত্রিকা- দৈনিক সমকাল, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ভালোবাসা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top