বিশ্ব অঙ্গনে ২০২১ সালে বাংলাদেশের অর্জন কী?

বাংলাদেশ নিয়ে অনেক সময় অনেককে নানা নেগেটিভ কথা বলতে দেখি। এই দেশে কেবল সমস্যাই খুঁজে পান তারা। যদি সবই সমস্যা হয়, তবে মনে রাখতে হবে আমরাই সেই সমস্যার অংশ। কোনো না কোনো ভাবে সেইসব সমস্যা, অসঙ্গতি আমাদের কারণেই জিওল মাছের মতো বেঁচে আছে দীর্ঘ সময় ধরে। না, এর মানে এই নয় আমি সমস্যাকে স্বীকার করছি না, কিংবা অসঙ্গতিকে উদযাপন করছি! সমস্যা অনেক, এর থেকে সহজে পরিত্রাণ হয়তো মিলবে না। কিন্তু একদিন সব সমাধান হবে, সাম্য ও সুন্দরের বাংলাদেশ হবে- এই আশাও আমি করি। করোনা মহামারির এমন বিপর্যয়ের মাঝেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের কার্যক্রম কিন্তু সুন্দর আগামীর ইঙ্গিত দেয়। খেয়াল করলেই স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশ নানা কারণেই আলোচনায় ছিল ২০২১ সালের পুরো সময়জুড়ে।  বিশ্ব অঙ্গনে যেসব অর্জন বাংলাদেশকে এবার পরিচিত করেছে তার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা কার্যক্রমে বাংলাদেশীদের অংশগ্রহণ, আমাদের তরুণদের বৈশ্বিক কার্যকলাপে অবদান, তাঁদের সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন, করোনা বিপর্যয়ের মধ্যেও অর্থনীতিকে সচল রাখার পদক্ষেপে সফল হওয়া, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উঠে আসা, শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং স্বীকৃতি ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করেছে। প্রশংসা পেয়েছে করোনাকালীন বিরূপ পরিস্থিতিতে এ দেশের এমন অগ্রগতির দিকটিও।

২০২১ সালে ‘বাংলাদেশ দিবস’ নামে একটি দিন ঘোষিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ২৬ মার্চকে ‘বাংলাদেশ দিবস’ ঘোষণা করা হয় ২০২১ সালের ২ এপ্রিল। ওয়াশিংটনের মেয়র মুরিয়েল বাউসার ২৬ মার্চকে ‘বাংলাদেশ দিবস’ ঘোষণা করেন। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে অভিনন্দন জানান। আর আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তথ্য প্রযুক্তির অলিম্পিক খ্যাত World Information Technology and Services Alliance, WITSA-এর ২০২১ সালের Eminent Persons Award দেওয়া হয় ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি প্রণয়ন করার জন্য। আর দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অনন্য অবদানের জন্য তিনি এসডিজিএস অ্যাওয়ার্ড পান। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০১৫ -২০২০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সূচকে এগিয়ে ছিল।  ২০২১ সালে আরেকটি গর্ব করার মত ব্যাপার ঘটেছে। সেটি হলো ইউনেস্কো-বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক পুরস্কারের প্রবর্তন। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রভৃতিসহ স্বীয় অধিক্ষেত্রে বিভিন্ন অঙ্গনে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তন করে থাকে। এর মধ্যে সংস্থাটি সর্বশেষ একটি পুরস্কার প্রবর্তন করেছে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশের কোনো প্রথিতযশা সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নামে ইউনেস্কো প্রবর্তিত এটাই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কার। শুধু তাই নয় ২০২১ সালেই ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য শীর্ষক কনভেনশন-এ বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সদস্যপদ পেয়েছে। তাছাড়া এ বছর ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতিসংঘের মাদকদ্রব্য বিষয়ক কমিশন, ইউনিসেফ ও ইউএন ওমেনসংস্থাগুলোতে বাংলাদেশ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। আর ৭ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ। এ সবই  বিশ্ব অঙ্গনে আমাদের অর্জন।

২০২১ সালে আমাদের তরুণদের অর্জন উল্লেখ করার মতো। বিখ্যাত মার্কিন ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস’-এর এশিয়ার ৩০ বছরের কম বয়সী উদ্যোক্তা ও সমাজ পরিবর্তনকারী (চেঞ্জমেকার) তালিকায় এ বছর প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছেন ৯ বাংলাদেশি। তালিকায় থাকা ৯ বাংলাদেশি হলেন আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সভিত্তিক উদ্যোগ ‘গেজ টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা শেহজাদ নূর তাওস ও মোতাসিম বীর রহমান, স্টার্টআপ ক্র্যামস্ট্যাকের প্রতিষ্ঠাতা মীর সাকিব; কুয়ালালামপুর-ভিত্তিক এনজিও অ্যাওয়ারনেস ৩৬০-এর প্রতিষ্ঠাতা শোমী হাসান চৌধুরী এবং রিজভি আরেফিন; অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ ইমতিয়াজ জামি, হাইড্রোকো প্লাসের প্রতিষ্ঠাতা রিজভানা হৃদিতা ও মো. জাহিন রোহান রাজীন ও পিকাবোর সহপ্রতিষ্ঠাতা মোরিন তালুকদার। ২০২১ সালেই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অলিম্পিক কমনওয়েলথ ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন ‘সেফহুইল’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ফয়সাল ইসলাম। কমনওয়েলথ ইয়ং পারসন অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হন বাংলাদেশের এই তরুণ। আর জাপানের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘অর্ডার অব দ্য রাইজিং সান’ লাভ করেন দুজন; মতিউর রহমান ও মোহাম্মদ আবু সায়েদ। ২০২১ সালের আর্নেস্ট অরল্যান্ডো লরেন্স অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন অধ্যাপক ড. এম জাহিদ হাসান। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ‘গ্লোবাল হিরো অ্যাওয়ার্ড ২০২০’ লাভ করেন ‘স্পৃহা বাংলাদেশ’-এর প্রধান নির্বাহী তাজিন শালিদ। মেম্বারশিপ অব দ্য রয়েল কলেজেস অব ফিজিশিয়ান্স অব দি ইউনাইটেড কিংডম (MRCPUK) পরীক্ষায় প্রথম হন বাংলাদেশের তরুণ চিকিৎসক মাহমুদুল হক জেসি।

চিকিৎসা, তথ্য প্রযুক্তি কিংবা বিজ্ঞানে আমাদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২১ সালে নাসার হাবল (NHFP) ফেলোশিপ পান একমাত্র বাংলাদেশি বিজ্ঞানী আনোয়ার জামান সজীব। এ বছর WHO-এর দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ‘রিজিওনাল ডিরেক্টরস স্পেশাল রিকগনিশন’ লাভ করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান প্রফেসর সোহেল রেজা চৌধুরী। আর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং কৃষি ও খাদ্য সংস্থার আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড লাভ করে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এই পুরস্কার পেয়েছে উদ্ভিদ মিউটেশন প্রজননে অবদানের জন্য।

বিশ্ব অঙ্গন এ বছর মাতিয়েছেন বাংলাদেশের মেয়েরাও। ভারতের ‘কালাম- ইয়ুথ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২১’ একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে লাভ করেন মাসুমা মরিয়ম। সার্ক উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ‘উইমেন ইন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন ব্যারিস্টার শুক্লা সারওয়াত সিরাজ, অধ্যাপক নাশিদ কামাল, বিজ্ঞানী ডা. ফেরদৌসী কাদরী, চিকিৎসক সাদিয়া মঈন; তল্লি সাহা: আফসানা; সাদিয়া খাতুন এবং নার্স শাহিদা খাতুন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন মাইসা খান। এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান করে নেওয়া বাংলাদেশি তিন নারী বিজ্ঞানী সামিয়া সাবরিনা, ড. ফেরদৌসী কাদরী ও সালমা সুলতানা। ভ্যাকসিন তারকার স্বীকৃতি পেয়েছেন যুক্তরাজ্যে হেলথ সার্ভিসে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক তাসনিম জারা। আর ১ নভেম্বর ২০২১ প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে ‘লেবুচে’ পর্বত জয় করেন জয়নাব বিনতে হোসেন শান্ত। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে খুম্বু হিমালয়ের এভারেস্ট বেসক্যাম্পের কাছাকাছি ৬ হাজার ১১৯ মিটার বা ২০,০৭০ ফুট উচ্চতার ‘লেবুচে’ পর্বত জয় করে লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন আমাদের এই পর্বতারোহী। সবচেয়ে ভালো লেগেছে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ নিপীড়িত নারীর উদ্দেশে সামিটটি উৎসর্গ করেছেন তিনি। আবার মার্কিন বিচার বিভাগে প্রথম বাংলাদেশি বিচারক হয়েছেন এ বছর, তাঁর নাম নুসরাত চৌধুরী। ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী’ লাভ করেছেন আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় সানজীদা খাতুন। WICC Award 2021 For Women of the Decade in Public Life and Leadership সম্মাননা লাভ করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মণি। 

এটা ভাবতেও ভালো লাগে, ২০২১ সালে জাতিসংঘের দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশের আটজন শান্তিরক্ষী। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা পদক ২০২১ লাভ করে ১৪০ জন বাংলাদেশি পুলিশ সদস্য। আর প্রথম বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা হিসেবে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব (অফিস অব মিলিটারি স্টাফ-এর চিফ অব স্টাফ) লাভ করেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে প্রথমবারের মতো নারী ‘জুডিশিয়াল এক্সপার্ট হিসেবে নিয়োগ পান বাংলাদেশের অধস্তন আদালতের চার নারী বিচারক আফসানা আবেদীন, নওরিন মাহবুবা, জেবুন্নাহার আয়শা ও লুবনা জাহান। সেটাও এই ২০২১ সালে।

এসবের বাইরে আমাদের আরও অনেক অর্জন নিশ্চয়ই আছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বীকৃতি হলো এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ। ২০২১ সালেই অন্যতম বড় এই স্বীকৃতি মিলেছে। মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯। আমরা স্বপ্ন দেখছি, ২০৪১ সালের মধ্যে আমাদের দেশ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে। আর লক্ষ্যেই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয় বাংলাদেশ।

বিশ্ব অঙ্গনে ২০২১ সালে বাংলাদেশের অর্জন কী?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top