বিকল্প পেশা নিয়ে ভাবছেন পদ্মা পাড়ের লোকজন

হাসান হামিদ

পদ্মা সেতু দিয়ে যান চলাচল শুরু হওয়ার মাধ্যমে উন্মোচন হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের যাতায়াতের নতুন দিগন্ত। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু  স্থাপনে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। একুশটি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ দূরত্ব ২ থেকে ৪ ঘণ্টা কমেছে, যোগাযোগ হয়েছে অনেক সহজ, দূর হয়েছে ভোগান্তি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঢাকার সাথে সরাসরি সংযোগ পথ হওয়ায় ঐ অঞ্চলের কাঁচামাল সরবরাহ এখন সহজ হবে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। পদ্মা সেতুর উভয় পাড়ে গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক ও প্রাইভেট শিল্পনগরী। ফলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং বাড়বে কর্মসংস্থানও। সব মিলিয়ে বহুল প্রত্যাশিত এই সেতুকে ঘিরে পদ্মার দুই পাড়ের মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের কোনো কমতি নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে শিল্প-বাণিজ্য ও পর্যটনের প্রসারের সম্ভাবনা হাতছানি দিলেও শিমুলিয়া-মাঝির হাট ঘাটকেন্দ্রিক হোটেল ব্যবসায়ী এবং কয়েক হাজার কর্মজীবী মানুষ শঙ্কায় আছেন। তাদের এই দুশ্চিন্তার কারণ হলো ঘাট বন্ধ হলে বন্ধ হয়ে যাবে তাদের দীর্ঘ দিনের ব্যবসা।

ঘাটের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার খবর খুবই আনন্দের। এই সেতুর কারণেই আমাদের পদ্মাপাড়ে আজ এত উন্নয়ন। রাস্তা-ঘাট হওয়ায় ঘরে যেতে এখন আর কাদাপানি মাড়াতে হয় না। সব মিলিয়ে উন্নয়নের জোয়ার বইছে এই অঞ্চলে। তবে সেতু চালু হলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণে বিকল্প পেশা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে আমাদের।

গত ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হওয়ার পর থেকে যান চলাচল শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের বাংলাবাজার লঞ্চ ঘাট ঘুরে দেখা যায়, সেতুর উদ্বোধন হওয়ার ফলে ঘাট হয়ে উঠেছে অনেকটাই নীরব। এতে বিপাকে পড়েছেন এই এলাকার হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া দীর্ঘ বছর ধরে কয়েক হাজার হকার লঞ্চ, স্পিডবোট এবং ফেরিঘাটে ঘুরে ঘুরে নানা রকম দ্রব্যাদি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাদের কেউ কেউ এখন অন্য পেশার কথাও ভাবছেন। যদিও ঘুরতে আসা লোকজনের কাছে তাদের বিক্রি করে কোনো মতে এখন টিকে আছেন।

জানা যায়, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী, মাঝির ঘাট নৌরুটে ৮৭টি লঞ্চ, দেড় শতাধিক স্পিড বোট, ১০টি ফেরি এত দিন ধরে চলেছে। এ সকল নৌযানে প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী নিয়মিত পার হন। এই যাত্রীদের ওপর নির্ভর করেই দুই পারের ঘাটগুলোতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ঘাট না থাকলে এসব দোকান ও বিক্রেতাও আর থাকবে না। ফলে সব মিলিয়ে হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে।

বেপারী হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক খোকন বেপারীর সাথে কথা বলে জানা যায়,  বাংলাবাজার ফেরি ঘাট হওয়ার পর থেকে হোটেল ব্যবসা করছেন তিনি। গত পাঁচ বছর হলো শিমুলিয়া ঘাটে এসেছেন। প্রথম দিকে ব্যবসা ভালো হতো। গত দেড় বছর ধরে এই লাইনে ফেরি ও লঞ্চ তুলনামূলক কম চলাচল করায় যাত্রী কমে গেছে। আর পদ্মা সেতু চালু হলে ঘাট বন্ধ হয়ে যাবে স্বাভাবিক নিয়মে। তখন তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে ভবিষ্যৎ কী হবে সেটা জানেন না।

বাংলাবাজার ঘাটের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মাপাড়ের এলাকার খেটে খাওয়া মানুষেরাই ঘাটে হকারি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এদের মধ্যে মুখরোচক খাবার বিক্রেতাদের সংখ্যাই হবে দুই শতাধিক। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, কেউবা রাত অবধি নৌযানে ঘুরে ঘুরে নানান খাবার-দাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। শিবচরের বাংলাবাজার ঘাটের হকার এমরান জানান, বাংলাবাজার-শিমুলিয়া ঘাটকে ঘিরে যারা জীবিকা নির্বাহ করছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিরীহ হচ্ছেন ঘাটের হকার শ্রেণির মানুষ। যারা লঞ্চ, ফেরিতে ঘুরে ঘুরে যাত্রীদের কাছে ঝালমুড়ি, ছোলা, সিদ্ধ ডিম, সিঙ্গারা, নারকেলচিড়া, শসা, দইসহ নানা রকম মুখরোচক খাবার বিক্রি করেন। প্রতিটি লঞ্চে বিভিন্ন রকমের জিনিস নিয়ে তিন থেকে চারজন হকার উঠেন। অনেক হকার ঘাটে ঘুরে ঘুরেও বিক্রি করেন। ঘাট দিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রীরা তাদের ক্রেতা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় থাকছে না ঘাটের ব্যবহার। আর যাত্রী না থাকায় তাদের ব্যবসায়ও বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

হকার এমরানের বাড়ি কাঁঠালবাড়ী এলাকায়। তার বেড়ে ওঠা এই ঘাটকে ঘিরে। পদ্মা সেতু চালু হয়েছে, এ নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই তার। তবে ঘাট বন্ধ হলে ব্যবসাও বন্ধ, তাই কপালে চিন্তার ভাঁজও রয়েছে। তিনি জানান, ঘাট এলাকার হকারদেরও পুনর্বাসন করা উচিত সরকারের। হঠাৎ করেই পেশা বদল করা যায় না। দীর্ঘদিনের পেশা বন্ধ হয়ে গেলে বিপাকে পড়তে হবে।

ঘাটে দীর্ঘ নয় বছর ধরে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন পলাশ। তিনি জানান, দীর্ঘদিনের পেশা বন্ধ হয়ে গেলে বিপাকে পড়তে হবে তার মত আরও অনেককে। অন্য কাজও এদের অনেকে জানেন না। আর ব্যবসা করতে হলে তো টাকার দরকার। এ কারণে হকারদের তালিকা করে সহজশর্তে ঋণ দিলে নতুন কিছু করতে পারবেন তারা- এমনটি মনে করেন তাদের কেউ কেউ।

ঘাটের বেশ কয়েকজন হকার জানান, বিকল্প পেশা নিয়ে সেতু নির্মাণের শুরু থেকেই তাদের অনেকের ভাবনা চলছিল। অনেকে বাড়ির কাছাকাছি ছোট্ট দোকানও দিয়েছেন বলে জানান। নিয়মিত চাসহ খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করছেন পরিবারের অন্য কেউ। ঘাট বন্ধ হয়ে গেলে ওই ব্যবসায় নিজে সময় দেবেন।

কেউ কেউ কৃষিকাজে নিয়মিত হবেন। পাশাপাশি পদ্মায় মাছ শিকার তো আছেই। এছাড়া অনেকেই শহরমুখী হবেন। সেতুকে ঘিরে পদ্মার পাড়ে একাধিক গ্রামীণ বাজার তৈরি হওয়াসহ বাজারের অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। পদ্মার পাড়ের নদী শাসন বাঁধসহ সেতু এলাকার অনেকটাই পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। বিকেলের দিকে অসংখ্য মানুষ আসেন ঘুরতে। সেক্ষেত্রে জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু না কিছুর ব্যবস্থা হয়ে যাবে বলে তাদের বিশ্বাস।

তবে আশার কথা, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন থেকেই ভ্রমণপ্রেমীদের আনাগোনা বেড়েছে এদিকে। পদ্মার দুই পাড়েই গড়ে উঠছে নতুন নতুন হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, যা ঘিরে আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে পর্যটন শিল্প। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতু ঘুরতে আসেন শত শত মানুষ। দেশের পর্যটনের মানচিত্র পাল্টে দেবে পদ্মা সেতু। এই সেতুকে ঘিরে শরীয়তপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুরের দুই পাড়ের সংযোগ সড়কের উভয় পাশেই পর্যটকদের জন্য নির্মাণ হচ্ছে বিনোদনকেন্দ্র, খাবারের দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁ। ঘাটের হকার, খাবার বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা এখন অনেকেই এদিকে চলে আসছেন। মোড় ঘুরেছে তাদের ব্যবসার। বেচাকেনাও ভালো হচ্ছে।

বিকল্প পেশা নিয়ে ভাবছেন পদ্মা পাড়ের লোকজন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top