প্রেমিক বিভূতিভূষণের দেশে : হাসান হামিদ

যে গল্পটা আপনাদের শুনাতে চাই, সেটির শুরুতেই যার কথা বলে নেওয়া উচিত, তাঁর নাম রমা। বয়স সতেরোর বেশি হবে না। বেশ সাহিত্যমনস্ক সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত এই তরুণী ম্যাট্রিক পাশ করেছে, কিন্তু কলেজে আর ভর্তি হয়নি। এঁর পিতা ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়৷ মধ্য চল্লিশের এই ভদ্রলোক সরকারি আবগারি বিভাগের অফিসার। মোটামুটি সচ্ছল পরিবার, বাবা আর মেয়ে- সংসারে দুটি মাত্র প্রাণি। রমা মাতৃহীনা; একই সঙ্গে বুদ্ধিমতী ও দেখতে বেশ সুশ্রী৷ ষোড়শীকান্ত বাবু ভেবেছিলেন, মেয়ে কলেজে পড়বে, উচ্চ শিক্ষিত হবে; এরপর তার জন্য উপযুক্ত পাত্র সন্ধান করবেন। কিন্তু মেয়ের এক কথা, কলেজে পড়ে কী হবে?
অবশ্য মেয়ে কিন্তু বাড়িতে প্রচুর পড়ে। ছোটোখাটো একটা লাইব্রেরি আছে তাঁর। সারাদিন সে ওই নিয়েই আছে। সাহিত্য পাঠ করে, নিজেও কিছু কিছু লিখে; তবে লুকিয়ে! দেশে তখন ব্রিটিশ শাসন চলছে। তখনও স্বাধীন হয়নি। জনগণের চেতনা জাগিয়ে তোলার জন্য লিখছেন যারা, তাঁদের অনেকের লেখাই রমা পড়ে। আর মনে মনে ভাবে, ইশ! আমিও যদি লিখতে পারতাম।

ষোড়শীকান্ত বাবু কন্যা রমাকে নিয়ে যে বাড়িটায় ভাড়া থাকেন সেটি বেশ সুন্দর। কিছু বাড়ি থাকে না সেখানে প্রবেশ করলেই কেমন যেন শান্তি শান্তি লাগে? এ বাড়িটিও ঠিক তেমন। কলকাতা শহর থেকে একটু বাইরের দিকে। একটূ দূরেই অবশ্যি, জায়গাটির নাম বনগাঁ। এখানেই পালপাড়ার একেবারে রাস্তার ধারেই দোতলা একটা বাড়ি৷ ষোড়শীকান্ত ভাড়া নিয়েছেন এ বাড়ির একতলা। আর দোতলায় থাকেন বাড়িওলার পরিবার৷ বাইরের দিকে সিঁড়ি, সুতরাং ভাড়াটে-বাড়িওলার স্বাধীন বিচরণে কোনও ঝামেলা নেই। রমাদের দুটি থাকার ঘর, একটা বিশাল বারান্দা, মোটামুটি সাইজের রান্নাঘর, আর একটা বাথরুম- এটুকুর মধ্যে পিতা-কন্যা নিজেদের দারুণ মানিয়ে নিয়েছে। আরও বিশেষ একটা ব্যাপার এ বাড়ির আছে। সেটি হলো একেবারে কাছেই এখানে বড় একটি লাইব্রেরি আছে। গ্রন্থাগারটির নাম রবীন্দ্র পাঠাগার৷ পাশের বাড়ির সমবয়সী বেনুর সাথে রমা এখানে প্রায়ই যায়। দুজনে বই আনে, পালা করে পড়ে, প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা দেখে৷

দুপুরবেলা গল্প করতে করতে বেনু এক দিন খুব ভালো একটা খবর দিল রমাকে৷ সে জানালো, তাদের এই এলাকায় একজন বিখ্যাত লেখক থাকেন। রমা জিজ্ঞেস করল, কে? বেনু জানায়, বিভূতিভূষণ! রমা যেন আকাশ থেকে পড়ে! অবাক হয়ে বলে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়! পথের পাঁচালীর লেখক?

রমা এবার দেখা করতে যেতে চায় লেখকের সাথে। তার যেন তর সয় না। বিভূতিভূষণের বাড়িটা শহর থেকে সামান্য বাইরে, নদীর কাছাকাছি৷ কিছুদিন পরে এক বিকেলে বেনুর সঙ্গে রমা চলল লেখকের বাড়িতে৷ রমা ভাবে, তাঁকে পাওয়া যাবে তো! বেনু যেন বুঝতে পারে রমার মন। সে বলে, তিনি বাড়িতেই থাকবেন, কেননা এখন আর অন্য কোনও কাজ করেন না, সাহিত্যচর্চাই তাঁর কাজ ও জীবিকা৷

কিছুটা পথ রিকশায়, বাকিটা হেঁটে দুজন অবশেষে পৌঁছে যায় বিভূতিভূষণের বাড়ি৷ একতলা বাড়ি৷ বেশ খানিকটা চ্যাঁচাড়ি বাঁশের বেড়া দেওয়া বাগান, সামনে বেড়ার ফটক৷ বাগানে কিছু ফুল ফুটে রয়েছে- চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, দোপাটি৷ বাড়ির এক পাশের পাঁচিল বেয়ে ছাদে লতিয়ে উঠেছে ফনফনে লাউডগা৷ বাড়ির ভেতরে গিয়ে যাকে পাওয়া গেল প্রথমেই, তিনি বছর ত্রিশের এক আটপৌরে মহিলা৷ রমা এগিয়ে গিয়ে বলল, নমস্কার৷ আমরা লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে দেখা করতে এসেছি। আমরা কি দেখা পেতে পারি তাঁর?
মহিলা জানালেন, তার নাম উমা। তিনি লেখকের ভাগনি। দুজনকে বসতে দিয়ে উমা এরপর ভেতরে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার বেরিয়ে এলেন৷ হাতে দু’কাপ চা আর নিমকি বিস্কুট৷ রমা আর বেনুর সামনে নামিয়ে বললেন, মামা আসছেন, আপনারা চা খান৷ বলে উমা চলে গেলেন।
সামান্য সময় পর লেখক এলেন৷ পরনে ধুতি, হাফহাতা গেঞ্জি৷ মধ্যবয়সী, প্রায় ষোড়শীকান্তর মতোই হবে মনে হল রমার৷ মুখে একটা উদাস চিন্তাচ্ছন্ন ভাব৷ মাঝারি গায়ের রং, মাঝারি উচ্চতা৷ মাদুরের উপরেই দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই রমা ও বেনু তাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে৷ বিভূতিভূষণ বুকের সামনে নমস্কারের ভঙ্গিতে দু’হাত জড়ো করে বললেন, থাক থাক, বসুন৷

সৌজন্যমূলক কিছু কথাবার্তার সূচনা করলেন বিভূতিভূষণই৷ কোথায় থাকেন, কী করেন, বাড়িতে আর কে আছেন, কী রকম বই-টই পড়েন, সাহিত্যে উত্‍সাহ কেন, নিজেরা চর্চা করেন কিনা… ইত্যাদি কথাবার্তা হল৷ রমাই অধিকাংশ কথার উত্তর দিল৷ একটু পরেই অটোগ্রাফের খাতাটি বিভূতিভূষণের কাছে বাড়িয়ে ধরল রমা৷ বিজড়িত সংকোচ সত্ত্বেও বলে ফেলল, একটা কিছু কথা যদি লিখে দেন, আমি সারা জীবন কৃতার্থ বোধ করব৷
খুব হালকা একটা হাসির আভাস ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলেন বিভূতিভূষণ৷ কিন্ত্ত যেন পারছেন না৷ খাতাটা টেনে নিলেন অবশ্য৷ সহজ ভাবেই মুক্তাক্ষরে লিখে দিলেন, ‘গতিই জীবন, গতির দৈন্যই মৃত্যু’৷ তার পর নাম সই করে তারিখ দিলেন৷
গভীর আগ্রহে খাতার লেখাটি দেখতে দেখতে রমার মনে হল, এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি তার জীবনে ইতিপূর্বে ঘটেনি৷ ফিরে আসার আগে, সনির্বন্ধ অনুরোধের মতো রমা বলল, আপনি যদি এক দিন আমাদের বাড়িতে পায়ের ধুলো দেন… আমার বাবা এবং আমরা সকলেই ভীষণ খুশি হব৷ আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাব৷
বিভূতিভূষণ বললেন, তার কোনও প্রয়োজন নেই৷ আমি নিশ্চয়ই এক দিন যাব, কিন্ত্ত কবে তা এখনই বলতে পারছি না৷ রমা বলল, সে ঠিক আছে, আমি খোঁজ নিয়ে যাব৷
অতঃপর মাঝেমধ্যে দেখাসাক্ষাত্‍টি অব্যাহত রইল৷

ষোড়শীকান্তও সমব্যথী হয়ে দু’এক বার দেখা করে এলেন নিপাট-ভদ্র-গুণী লেখকটির সঙ্গে৷ কয়েক মাসের মধ্যে বিভূতিভূষণও সত্যি সত্যি এক বার ঘুরে গেলেন রমাদের বাড়ি থেকে৷ তার পর দিন যায়৷ পারিবারিক ভাবেই যেন একটি বাঁধন রচিত হল৷ প্রকৃতিমুগ্ধ প্রেমিক অথচ কিছুটা নিঃসঙ্গ মানুষ বিভূতিভূষণ৷ বেশ কয়েক বছর আগে তাঁর পত্নী গৌরীদেবীর মৃত্যু হয়েছে৷ তার পর তিনি আর দ্বিতীয় বার বিবাহের কথা মনে স্থান দেননি৷ বিভূতিভূষণ এখন প্রৌঢ়। এসময় তার সাহিত্য-অনুরাগী রমা চট্টোপাধ্যায় সোজাসুজি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন তাকে। রমা তার থেকে বয়েসে অন্তত তিরিশ বছর ছোট। প্রস্তাব শুনে বিভূতিভূষণ গায়ের জামা খুলে বুকের কাঁচাপাকা লোম দেখিয়ে বললেন, “দ্যাখো, আমার অনেক বয়স হয়েছে, আর ক’দিনই বা বাঁচব?” জবাবে সদ্য যুবতী রমা অবলীলায় বলেন, “আপনি যদি আর মাত্র একটা বছরও বাঁচেন, তাহলেও আমি আপনাকেই বিয়ে করব।” এরপর আর কী কোনো কথা থাকে? ১৯৪০ সালের ৩ ডিসেম্বর রমার সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন বিভূতিভূষণ। রমার বয়স আঠারো, বিভূতিভূষণের ছেচল্লিশ৷

কিছুদিন পর থেকেই বিভূতিভূষণের শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না৷ হাওয়া বদলের প্রয়োজন অনুভূত হল৷ দেরি না করে সপরিবার পুনর্বাসন হল বিহারের (বর্তমান ঝাড়খণ্ডে) স্বাস্থ্যকর পাহাড়ি অঞ্চলে, সুবর্ণরেখা নদীর ধারে, ঘাটশিলা শহরে৷ এর আগে বিভূতিভূষণ থাকতেন বারাকপুর গ্রামে, তাঁর সেই বাড়িতে। তিনি এই বাড়ি সইমার কাছ থেকে কিনেছিলেন ১৯৩৮ সালে। সুপ্রভা দত্তকে লেখা তাঁর এক চিঠিতে উল্লেখ আছে. “আমি সইমার সেই বাড়িটা কিনেছি, কাল প্রথম সেই বাড়িতে রাত্রি কাটালুম মালিক হিসেবে। খুব বড় একটা শিউলি গাছ আছে উঠোনে… ”। এর ঠিক পরের বছরই বিভূতিভূষণ ঘাটশিলায় এই বাড়িটি ক্রয় করেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী গৌরী, যিনি বিয়ের মাত্র এক বছরের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন। ঘাটশিলার বাড়ি কেনার পর প্রথম স্ত্রীর নামে তিনি এ বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘গৌরীকুঞ্জ’। এই গৌরীকুঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা তখন বিভূতিভূষণের সর্বকনিষ্ঠ এবং একমাত্র জীবিত সহোদর ডাক্তার নুটুবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর স্ত্রী যমুনা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বাড়ির কথা কেন লিখছি? কারণ এটি বিশেষ এবং ঘাটশিলায় এ বাড়িটি কিনবার পিছনে একটা গল্প আছে।

মুকুল চক্রবর্তীর লেখায় সেই কাহিনির বিস্তারিত পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, “বাড়িটা আগে ছিল অশোক গুপ্তের। গুপ্ত সাহেব ছিলেন একজন অতি উচ্চ শিক্ষিত আদর্শবাদী শিক্ষাবিদ। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই বিলেতে থাকতেন। অবসরপ্রাপ্ত জীবনে বিকলাঙ্গ ও মানসিক অপরিণত শিশুদের শিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এক পরিকল্পনা খাড়া করলেন। ইংরেজ সরকার কর্ণপাত করলেন না। অশোক গুপ্তের স্ত্রীও ছিলেন তাঁর উপযুক্ত সহধর্মিণী। ওঁরা স্বামী-স্ত্রী মিলে স্থির করলেন ক্ষুদ্রতর পরিবেশে ঐ বিষয় নিয়েই গবেষণা করে যাবেন। দু-দশটি বিকলাঙ্গ ও অপরিণতবুদ্ধি শিশুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। এইজন্য চাই গ্রাম্য নির্জন পরিবেশে একটা আস্তানা। অনেক স্থান ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঘাটশিলার ঐ জনহীন স্থানটিই পছন্দ হল দুজনের। বাড়িটি তাঁরাই তৈরি করেন। সীমিত ক্ষমতার ভিতর যতটুকু সম্ভব পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। ঐ সময়েই বিভূতিভূষণের সঙ্গে অশোক গুপ্তের পরিচয় হয়। ওঁর ভাবনার কথা শুনে বিভূতিভূষণ তাঁকে খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন। তাঁর আর্থিক দুরবস্থার কথা শুনে বিভূতিভূষণ গুপ্ত সাহেবকে তখন পাঁচশত টাকা কর্জ দেন। তারপর ক্রমে ক্রমে গুপ্ত সাহেব নানাভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিল তিল করে ওঁর প্রতিষ্ঠান নিঃশেষ হয়ে গেল। গুপ্ত সাহেবের স্বাস্থ্যও ভেঙ্গে পড়ল। বিভূতিবাবু ইচ্ছাসত্ত্বেও গুপ্ত সাহেবের খোঁজ খবর নিতে পারতেন না, পাছে গুপ্ত সাহেব ভাবেন টাকাটা ফেরত পাওয়ার জন্যই বিভূতিবাবু খোঁজ করছেন।

একদিন কলেজ স্ট্রীটে বইয়ের দোকান থেকে বের হয়েই বিভূতিবাবু দেখতে পেলেন বিপরীত ফুটপাত দিয়ে অশোক গুপ্ত এই দিকেই আসছেন। বিভূতিভূষণ তৎক্ষণাৎ হাতের ছাতাটি খুলে মুখটা আড়াল করে পাশ কাটাতে চাইলেন, কিন্তু তার পূর্বেই গুপ্ত সাহেব তাঁকে দেখে ফেলেছেন।

“বিভূতি না?”

অপ্রস্তুত বিভূতিভূষণের তখন ‘ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা’। গুপ্ত সাহেব এগিয়ে এসে বিভূতিভূষণের হাতটি ধরে বললেন, “আমার একটা উপকার করতে হবে বিভূতি, না বললে শুনব না।”

বিভূতিবাবু অশোক গুপ্তকে দাদ৷ ডাকতেন। ঐ আদর্শবাদী সর্বত্যাগী শিক্ষাবিদের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ছিল তাঁর। বললেন– “নিশ্চয় রাখব। বলুন দাদা।”

“আমাকে ঋণমুক্ত করতে হবে। আমার ছেলেখেলা শেষ হয়েছে ভাই। দুনিয়াদারীর হাটে যা কিছু ঋণ ছিল সব একে একে মিটিয়ে দিয়েছি। বেশ বুঝতে পারছি ডাক এসেছে। তোমার ঐ পাঁচশ টাকা—।”

বিভূতিভূষণ আমতা আমতা করে বললেন, “তা সুযোগ সুবিধা মত এক সময় দিয়ে দিলেই চলবে।”

“না না বিভৃতি। তুমি যখন আমায় দাদা বলেছ, তখন আমাকে ঋণমুক্ত করে দেবার দায় তো তোমার। ঋণ নিয়ে মরেও আমি শান্তি পাব না। শোন, ঘাটশিলায় যে আমার বাড়িটা তৈরি করেছি, ওটাই তোমার নামে লিখে দেবো। ঐ টাকার পরিবর্তে তুমি বাড়িখানা নিয়ে আমায় ঋণমুক্ত কর।”

বিভূতিভূষণ প্রচণ্ড আপত্তি জানালেন, “তা কেমন করে হবে। একখানা বাড়ির দাম ৫০০ টাকার অনেক বেশি। তা হলে আর কত টাকা আপনাকে দিতে হবে বলুন।”

“না, আর কিছুই তোমাকে দিতে হবে না। গুপ্ত সাহেব রেজিষ্ট্রি করে বাড়িটা ওঁকে দিয়ে গেলেন। চমৎকার বাড়ি। খোলার চাল সিমেন্টের মেঝে, তিনখানা ঘর, সামনে বারান্দা, রান্নার জায়গা, ভাঁড়ার ঘর এবং সামনে একটি প্রশস্ত উঠান। গুপ্ত সাহেব যতই আদর্শবাদী হন, তিনি বিলাত-ফেরত মানুষ। বাড়িটি তাই ঝকঝকে তকতকে করেছেন। মাল মশলাও ভাল ছিল। ভাল এবং মজবুত। বেশ শক্ত বাঁধুনি। সামনের বারান্দায় দাঁড়ালে সুবর্ণরেখা এবং তার ওপারে অনতিদূরে পাহাড়ের দৃশ্যে অভিভূত হতে হয়। বিভূতিভূষণ বাড়ির নাম দিলেন গৌরীকুঞ্জ।” এই হল ঘাটশিলার গৌরীকুঞ্জের ইতিহাস। এই গৌরীকুঞ্জেতেই ১৯৫০ সালে পুজোর ছুটি কাটাচ্ছিলেন তিনি। আর এখানেই ১৯৫০-এর ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় এই ইহলোক ত্যাগ করেন বিভূতিভূষণ।

লেখালেখিতে এত ব্যস্ত ছিলেন বিভূতিভূষণ, সেই শেষ সময়ের আগে আগে ১৯৫০ সালের পুজোর ছুটিতেও তাঁর কাজের শেষ নেই। সেবার সেপ্টেম্বর মাসে বিভূতিভূষণের জন্মদিন অনুষ্ঠান হয়েছিল কলকাতায়, তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামার বাড়িতে। এই অনুষ্ঠানে গজেন্দ্র কুমার মিত্র বিভূতিভূষণকে একটি কালো কভারে ঢাকা বাঁধানো খাতা উপহার দেন, যার উপরে ইংরেজিতে সোনালি অক্ষরে লেখা ‘কাজল’। ‘কাজল’ লিখতে হবে, লিখতে হবে ‘ইছামতী’র দ্বিতীয় খণ্ড, যার প্রস্তুতি চলেছে ছোটো ডায়েরিতে। প্রচণ্ড ব্যস্ত তিনি। কিন্তু যেদিন সন্ধ্যায় দলভূমগড়ের রাজ এস্টেট থেকে অসুস্থ শরীরে ফিরেছিলেন, সেই ২৯ অক্টোবরও ভোরে সূর্যের আলো ফুটবার আগে স্ত্রীকে ডেকে তুলেছেন ঘুম থেকে, “ওঠো ওঠো। গেট খুলে দাও। ‘কাজলের’ ছক তৈরি করব না আজ? মনে নেই? উপাসনা সেরে নেব না। আমার সেই শিলাসনে। তারপরে লেখা।”

বিভূতিভূষণের যেখানে বাড়ি সে জায়গাটি ছিল বেশ স্বাস্থ্যকর। রাস্তার একপাশে মানুষের বসতবাড়ি, অপরপাশে রেললাইন। পাশে ফুলডুংরি পাহাড়। লেখা আর উপাসনা করার জন্য একটা জায়গা ছিল ফুলডুংরির পিছনে বনের মধ্যে এক বিরাট পাথরের উপরে। সেখানে বসে লিখতেন তিনি। সেদিন বাড়ি ফিরতে দেরি হল। প্রায় সাড়ে দশটা-এগারোটা নাগাদ তিনি বাড়িতে পৌঁছুলেন। বিভূতির পেটে তখন বেশ খিদে ছিল। বাড়ি ফিরেই তিনি তাঁর স্ত্রী কল্যানীকে ডাকলেন। বললেন দ্রুত কিছু খেতে দিতে। কিন্তু যেটুকু খাবার তাঁকে দেওয়া হলো, তাতে খিদে মিটল না একেবারেই। এরপর আরো কিছু খেতে চাইলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলেন ঘরে আর কিছু আছে কিনা।

নারকেল-চিড়ে অতি প্রিয় আবার ছিল বিভূতিভূষণের। কল্যাণী জানালেন, ঘরে তা আছে এবং তাই খানিক এনে দিলেন। খাওয়ার পর অল্প সময় শুয়ে থাকলেন বিভূতিভূষণ। কিন্তু ভালো লাগছিল না। খুব অস্বস্তি লাগছিল তাঁর। মনে হচ্ছিল, বুকে যেন চিঁড়ে আটকে যাচ্ছে! সাতাশ বছরের কল্যাণী বলেছিলেন, “শুকনো চিঁড়ে খেলে এমনিই হয়। ভিজিয়ে খেতে চাও না। আম কলা না থাকলে। কত ঘুরে এসেছ, গলা শুকিয়ে আছে না?” সারাজীবনে খুব কমই ওষুধ খেয়েছেন যে মানুষ, তিনি সেদিন কোরামিন চাইলেন। বিচলিত হলেন কল্যাণী। কিন্তু দশ ফোঁটা কোরানিন খেয়ে বিভূতিভূষণ সামলে নিলেন নিজেকে। বিশ্রাম নেওয়ার পর কিছুটা আরাম হলো। রাতে ভালো ঘুমও হলো তাঁর।

নারকেল-চিড়ে অতি প্রিয় আবার ছিল বিভূতিভূষণের। কল্যাণী জানালেন, ঘরে তা আছে এবং তাই খানিক এনে দিলেন। খাওয়ার পর অল্প সময় শুয়ে থাকলেন বিভূতিভূষণ। কিন্তু ভালো লাগছিল না। খুব অস্বস্তি লাগছিল তাঁর। মনে হচ্ছিল, বুকে যেন চিঁড়ে আটকে যাচ্ছে! সাতাশ বছরের কল্যাণী বলেছিলেন, “শুকনো চিঁড়ে খেলে এমনিই হয়। ভিজিয়ে খেতে চাও না। আম কলা না থাকলে। কত ঘুরে এসেছ, গলা শুকিয়ে আছে না?” সারাজীবনে খুব কমই ওষুধ খেয়েছেন যে মানুষ, তিনি সেদিন কোরামিন চাইলেন। বিচলিত হলেন কল্যাণী। কিন্তু দশ ফোঁটা কোরানিন খেয়ে বিভূতিভূষণ সামলে নিলেন নিজেকে। বিশ্রাম নেওয়ার পর কিছুটা আরাম হলো। রাতে ভালো ঘুমও হলো তাঁর।

পরদিন পুকুরে স্নান করতে গেলেন একা। অন্যদিন হলে বাবলুকে সাথে নিতেন। বাবলু তাঁর তিন বছর বয়সী ছেলে। বাবলুকে সঙ্গে নিলেন না বলে উদ্বিগ্ন হলেন কল্যাণী। তিনি বারবার বলেছিলেন ঘরেই স্নান করতে। বিভূতি আম্নলেন না। তিনি বাবলুকে ছাড়াই স্নান করে এলেন। সেদিন বিকেলে ছিল ধলভূমগড় রাজ এস্টেটের বঙ্কিম চক্রবর্তীর ডাকা বিজয়া সম্মিলন। তিনি সকলের নিষেধ অগ্রাহ্য করে বৈকালিক চা চক্রে যোগ দিতে চলে গেলেন। অভয় দিয়ে গেলেন “আমার কিছু হবে না, যাব আর আসব।” সঙ্গে প্রমথনাথ বিশী, সুমথনাথ ঘোষও ছিলেন।

প্রতুলচন্দ্র রক্ষিত এ নিয়ে লিখেছেন, “বঙ্কিমবাবু আমাদের তিনজনকে সাদর অভ্যর্থনা করে নিয়ে তাঁর প্রকাণ্ড ড্রইংরুমে বসালেন। তাঁর গৃহিণী এবং দুই কন্যার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বিভূতিবাবুকে নিজেদের বাড়িতে পেয়ে ওঁরা সবাই আনন্দে উচ্ছ্বসিত। বিশেষ করে বঙ্কিমবাবুর মেয়েরা। তারা দু’তিনটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শোনাল, বড় মেয়েটি সেতার বাজিয়ে শোনাল। বঙ্কিম-গৃহিণী আমাদের জন্য প্রচুর খাবার এনে উপস্থিত করলেন। বিভূতিবাবু খেতে ভালবাসতেন, সবাই জানে। কিন্তু সেদিন তিনি প্রায় কিছুই খেলেন না। বললেন, শরীরটা ভাল লাগছে না।” কেবল একটা জিনিস খেয়েছিলেন, যা না থেলেই ভাল হত, শিঙাড়া।

শরীর খারাপ লাগায় বিভূতিভূষণ বাড়ি ফিরতে চাইলেন। তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল প্রার্থনাথ বিশী এবং সুমথ ঘোষের। ফিরবার পথে মাইলখানেক এসে পদ্মপুকুরের হাটের কাছে বিভূতিভূষণ গাড়ি থামাতে বললেন। গাড়ি থামিয়ে, গাড়ি থেকে নেমে সামান্য একটু বমি করলেন বিভূতিভূষণ। বললেন, ‘বড় অস্বস্তি হচ্ছে। সেদিন বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিল, তখনো রাতের আকাশে ছিল ঘন কালো মেঘ, পথ ছিল জনমানবশূন্য। পোশাক-পরিচ্ছদে চিরকাল উদাসীন, কখনো বা বিসদৃশ যে বিভূতিভূষণ, তাঁর সাজগোজ সেদিন ছিল রাজবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষার উপযুক্ত। কল্যাণীর একান্ত ইচ্ছায় তাঁকে সেদিন সাজতে হয়েছিল।

শরীর খারাপ লাগায় বিভূতিভূষণ বাড়ি ফিরতে চাইলেন। তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল প্রার্থনাথ বিশী এবং সুমথ ঘোষের। ফিরবার পথে মাইলখানেক এসে পদ্মপুকুরের হাটের কাছে বিভূতিভূষণ গাড়ি থামাতে বললেন। গাড়ি থামিয়ে, গাড়ি থেকে নেমে সামান্য একটু বমি করলেন বিভূতিভূষণ। বললেন, ‘বড় অস্বস্তি হচ্ছে। সেদিন বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিল, তখনো রাতের আকাশে ছিল ঘন কালো মেঘ, পথ ছিল জনমানবশূন্য। পোশাক-পরিচ্ছদে চিরকাল উদাসীন, কখনো বা বিসদৃশ যে বিভূতিভূষণ, তাঁর সাজগোজ সেদিন ছিল রাজবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষার উপযুক্ত। কল্যাণীর একান্ত ইচ্ছায় তাঁকে সেদিন সাজতে হয়েছিল।

প্রতুলবাবুর বাড়ি পড়ে সবার আগে। তিনি অনুরোধ করেছিলেন, বিভূতিভূষণ যদি নেমে, মুখ ধুয়ে, একটু বিশ্রাম নিয়ে যান। কিন্তু বিভূতিভূষণ তাড়াতাড়ি গৌরীকুঞ্জে পৌঁছতে চাইছিলেন। অবশেষে সন্ধ্যা আটটা সাড়ে আটটায় যখন ফিরলেন তখন রীতিমত অসুস্থ। তাঁর অবস্থা বেশ খারাপ। সকলে ধরাধরি করে তাঁকে বাইরে বারান্দায় এনে শোয়ালো। কিন্তু তাঁর অবস্থা ভালো মনে হচ্ছিল না। তখন হাত পা বেশ ঠাণ্ডা। হতভম্ব কল্যাণী। সহোদর ডাক্তার হুটুবিহারী ফিরে এসে সব শুনে দাদার অবস্থা দেখে অস্থির হয়ে পড়লেন। হুটুবিহারী ওষুধ দিলেন, স্থানীয় ডাক্তারও এসে দেখলেন। কেউ কিছু করতে পারলেন না। এরপর টাটানগর থেকে ব্রহ্মপদ ডাক্তারকে আনার ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু তখন বিভূতিভূষণের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে, অক্সিজেন চলছে। অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে লাগল। আর বুঝি সময় নেই!

এরপর তিনি দিনও কাটল না। বিভূতিভূষণ বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর ডাক এসে গেছে। ততদিনে খবর পেয়ে বহু মানুষ তাঁকে দেখতে এসেছে। উপস্থিত সকলের কাছ থেকে তিনি বিদায় নিচ্ছিলেন। স্ত্রী কল্যাণী এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে কাঁদছিলেন। এরপর ১ নভেম্বর, ১৯৫০, রাত ৮টা ১৫ মিনিটে অবসান হল এক মহাজীবনের। সেই মুহূর্তটিতে তাঁর চোখ ছিল তিন বছর বয়সী পুত্র বাবলুর মুখের দিকে। তিনি আসলে তখন কী ভাবছিলেন?

(ঋণস্বীকার- উপল ব্যথিত গতি: যমুনা বন্দ্যোপাধ্যায়; বিভূতিভূষণ: রুশতি সেন, প্রসঙ্গ ও প্রসঙ্গত বিভূতিভূষণ: সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়)

প্রেমিক বিভূতিভূষণের দেশে : হাসান হামিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top