প্রাপ্তবয়স্ক ভূতের গল্প

দুপুর নাগাদ সবাই জেনে যায় একটি বস্তাবন্দি পচা লাশ পাওয়া গেছে, দোকানদার রমিজ মিয়াকে খবর দেয়া হয় ।

রমিজ মিয়ার চায়ের দোকান আমাদের বাড়ি থেকে কাছেই । আমাদের গ্রামটি পুরোপুরি গ্রাম নয়; আধা শহর- আধা গ্রাম । গ্রামের উত্তরমাথায় আমাদের বাড়ি । আর বাড়ির পাশে ছোট কালবার্টের একদিকে রমিজ মিয়ার দোকান । এই ব্যবসার বয়স ষাটের কাছাকাছি । সেই শুরুর দিন থেকে আজও এখানে বসে চা খেতে খেতে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ জমায় ছেলে-বুড়োরা। প্রতিদিন অন্য সব যাপন করা না গেলেও এই আড্ডার কোনো হেরফের হয় না ।

প্রায় পাঁচ যুগ ধরে এখানে জমে থাকে দিন, জমা থাকে জীবন । আর এ দোকান নিয়ে রমিজ মিয়ার গর্বও আছে । এখানে দেশের অনেক নেতা, যারা দেশ গড়েছেন, ভেঙেছেন; তারা অনেকেই চা খেয়েছেন। নিজের হাতের দিকে চেয়ে প্রায়ই রমিজ মিয়া আমাদের বলেন, ‘‘বুঝলা বাবা, এই হাত দিয়া কত জনরে চা বানাইয়া খাওয়াইলাম; এই ধরো শেখসাব, ভাসানীসাব কারে না খাওয়াইছি!’’

কথা কিন্তু সত্য আছে । ষাট বছর কম কথা না । রমিজ মিয়ার বাপে দিছিলো এ দোকান । বাপ বুড়ো ছিল তার, আটবছর যখন বয়স; তখন থেকেই বাপের সাথে দোকানে বসতো সে । সময়ে সাধারণকেও অসাধারণ করে । সকাল থেকে রাত অবধি রমিজ মিয়া মানুষটা আসলে আপাদমস্তক এ দোকানটিই । আরও একজন অবশ্যি আছে তার; মা-মরা মেয়ে কুসুম । বয়স এগারো । পাশের স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে ।

কুসুম যখন অন্য অকাজে ব্যস্ত না থাকে; অথবা ছেঁড়াকাঁথায় পা ডুবিয়ে পড়তে আর ইচ্ছে করে না ঘরের একমাত্র কক্ষটিতে; তখন বাবার সাথে ইতিহাস নিয়ে গল্প জমায় । বাবা ভূতের গল্প শোনাতে চায়, কুসুম ওসবে বিশ্বাস করে না; স্কুলের স্যার তাকে বলেছে, ভূত বলে কিছু আদতে নাই । বাবাকে পড়ার ফাঁকে কাজেও সাহায্য করে । সেবার রমিজ মিয়া জ্বরে পড়েছিল, এক-দুই দিন নয়; পনেরো দিন । সেকি জ্বর! যেমন তেমন নয় । উঠে দাড়ানোই দায়, দোকানে যাবে কীভাবে । দোকান বন্ধ করার উপক্রম হলো । কুসুম বললো, বাবা, আমি বসবো দোকানে । টানা দুই সপ্তাহ বিজ্ঞ দোকানি হয়ে সব করলো সে । এমনভাবে সামলেছে, মনে হয়েছে এ ব্যবসা কতোদিন ধরে সে-ই চালায় ।

সকাল বেলাটা ভারী ভালো লাগে কুসুমের । এই সময়টাতে পাশের মসজিদে কুরআন পড়তে শিখে টানা দুই ঘন্টা । ইমাম হুজুর লোকটা ভালো । রমিজ মিয়ার সাথে সম্পর্কও দারুণ । কথায় কথায় কুসুমের প্রশংসাও করেন হুজুর । সকালের প্রথম চা-টা রমিজ মিয়া তাই হুজুরকে দিতে ভুলে না ।

একদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি । কুসুম পড়তে যায় । গিয়ে দেখে ইমাম হুজুর মসজিদের বারান্দায় শুয়ে আছেন । বৃষ্টি আরও বেড়ে যায় । আর কেউ আজ পড়তে আসবে বলে মনে হচ্ছে না । কুসুম  হুজুরকে বলে বাড়ি চলে যাবে কিনা । হুজুর তাকে পড়তে বলে । কুসুম জোরে জোরে পড়তে থাকে ।

হুজুর কুসুমকে বলেন, বুঝলা কুসুম, রাত বিরাতে বের হয়ো না । এমুন ঝড় বৃষ্টির সময়ে জিন-পরিদের আনাগোনা বেড়ে যায় । তাছাড়া তুমি তো ঘরে একা ।

কুসুম বলে, না হুজুর, বাবা আমার লগেই থাহে ।

হুজুর বলেন, আরে সেইটা না । মাইয়া মানুষ তো তুমি একা । ভূতে যদি আইসা ধরে, উপায় আছে?

কুসুম বাধা দিয়ে বলে, কিন্তু বিজ্ঞান স্যার তো কয় ভূত বলে কিছু নাই ।

‘ওয়াস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন হুজুর । একটু পরে বাতাসের বেগ আরও বাড়ে । কুসুম এবার বাড়ি যেতে চাইলে হুজুর বৃষ্টি দেখিয়ে বললেন, বান কমুক, তারপর যাবা । কুসুম জোরে জোরে পড়তে থাকে । হুজুর তার পাশে আধশোয়া । অদূরে আচমকা বাজ পড়ে কোথাও ।

এদিন আর কুসুম বাড়ী যায়নি । পরদিন কুসুমের লাশটি পাওয়া যায় পাড়ার পাশের ডোবায় ।

প্রকাশিত পত্রিকা- দৈনিক প্রথম আলো, ২৬ এপ্রিল ২০১৯

প্রাপ্তবয়স্ক ভূতের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top