পুরোনো সেই বইয়ের কথা

হাসান হামিদ

পৃথিবীতে আমরা যতোদিন বাঁচি, সে যে কদিনই হোক; নানা গন্ধ আমাদের টানে। পড়ুয়াদের প্রায়শই বলতে শোনা যায়, তাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়তম গন্ধটি হয় নতুন বইয়ের। আবার পুরোনো বইয়ের দোকানেও কেউ কেউ মাতালের মতো ঘুরে বেড়ায়। আমি খুব ভালো পাঠক যদিও নই, তবুও আমার জীবনের অন্তত অর্ধযুগ সময়ের দিনরাত্রির বেশিরভাগ সময় কেটেছে বাংলাবাজার, কাঁটাবন, নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলোতে অজানা এক গন্ধ শুঁকে শুঁকে।সত্যি বলতে আমার একটা সময় ওই গন্ধ ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগতো না। পুরোনো বা পছন্দের বইয়ের গন্ধের প্রেমে পড়লে তাকে কিন্তু বইপ্রেম শুধু বলে না; ঘেঁটে দেখলাম নাছোড়বান্দা এই খোঁজাখুঁজির ব্যাপারটি আসলে একটি ডিজিজ। এই রোগটিকে বলে বিবলিওস্মিয়া। চোখের সামনে বই মেলে রাখা ছাড়া এই রোগের আর কোনো চিকিৎসা নেই। তবে আমার মনে হয়, কোনো জাতির যতো বেশি মানুষের এই বিবলিওস্মিয়া রোগ হবে, পৃথিবীতে জাতি হিসেবে তাদের শ্রেষ্ঠ হবার সম্ভাবনা ততো বেড়ে যাবে।

আমরা যারা অল্প অল্প বই পড়ি, বইয়ের গন্ধ নাক চেপে যাদের বোধের দরজায় প্রতিনিয়ত কড়া নাড়ে, যারা বই ভালোবাসি তাদের নিশ্চয়ই এও জানতে ভালো লাগবে কবে থেকে এলো আজকের এই বইয়ের ধারণা। বদ্ধ মলাটজুড়ে জীবনকে ধরার এই সুযোগ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল; এবং কবে তা নিয়ে বলতে হলে কাগজের কথা আগে বলে নিতে হয়। কাগজে ছাপা হয়ে কোনো কিছু কোনো একদিন এমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তা কেউ ভাবেনি তখন!আসলে মলাটবদ্ধ অবস্থায় কতগুলো কাগজ একসাথে একটি বই হয়ে কোনো দিন মানুষের হাতে হাতে ঘুরবে বা বাসার শেলফে শোভা পাবে, এমনটা খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ সালেও কেউ চিন্তা করেনি। যারা অল্প অল্প ইতিহাস পড়ি, তারা জানি, ভাষার শুরুটা হয়েছিল ছবি এঁকে। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় মানুষ সেই সময় তখন কাদা দিয়ে সমতল আয়তক্ষেত্র বানাতো, তারপর সেখানটায় বিভিন্ন চিহ্ন আঁকতো।

কেন এটা করতো তারা? তারা আসলে তাদের চিন্তাকে দীর্ঘদিন মনে রাখার জন্য এই কাজ করতো। এরপর খ্রিষ্টপূর্ব ২৪০০ সালে শুরু হলো প্যাপিরাসের ব্যবহার। গাছটির কাণ্ডের দিকটা লম্বালম্বি পাতলা করে কেটে শুকিয়ে নিয়ে মিসরীয়রা তাতে লিখত। এরপর মানুষ প্রায় তিন হাজার বছর কাটিয়ে দিল শুধু কীভাবে লেখা হবে সেটি ঠিক করতে! কীভাবে মানে লেখা কি ডান থেকে বায়ে, নাকি বাম থেকে ডানে? এরপর যে যার সুবিধামতো নিয়ম তৈরি করল। আরবি আর হিব্রু ভাষা ডান থেকে বাঁয়ে লেখার প্রচলন হলেও বেশির ভাগ ভাষা বাম থেকে ডান দিকটাকে বেছে নিল।

ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের সময়ে লেখা হতো বিভিন্ন পশুর চামড়ায়। ১০৫ সালে সম্ভবত প্রথম কাগজে যে লেখা যায় তা মানুষ বুঝতে পারলো। চীনে এর আরও অনেক আগেই কাগজ বানানো হতো; তবে তাতে যে লেখা যায় তা তখনো তারা ভাবেনি। তারা মূলত সেই কাগজ বিভিন্ন জিনিসপত্র মোড়ানোর কাজে ব্যবহার করত। কাগজে লেখার সঙ্গে টুকরো ছবি জুড়তে ৬০০ সাল এসে পড়ল। এভাবে চীনে ছবিসহ বই ছাপা হলো প্রথমে ৮৬৮ সালে। তখন একদিকে চীনে ব্লক প্রিন্ট বই ছাপানো হচ্ছে, আরেক দিকে একই চেষ্টা চলছে ইউরোপে। ১৪৫০ সালের দিকে ইউরোপের কয়েকটি স্থানে অক্ষর বসিয়ে প্রথম বই ছাপানোর কাজ শুরু হয়। আমাদের এশিয়ার এদিকটায় তখন গাছের বাকল, কলাপাতা বা তালপাতায় হস্তাক্ষরে পুঁথি লেখা হত।

জার্মানির জোহানেস গুটেনবার্গ ছাপাখানা আবিষ্কার করেন। তার এ আবিষ্কারের আগে প্রতিটি বইয়ের প্রতিটি অক্ষর হাতে লেখা সত্যিই সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য ছিল। আর তখন বই তৈরি ছিল ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘতর একটি প্রক্রিয়া। গুটেনবার্গ মূদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করে এই পুরো কঠিন ব্যাপারটিকে অতি সহজ করে দিলেন। গুটেনবার্গ তার ছাপাখানায় নিজে যে বইটি প্রথম ছাপেন সেটি ছিল বাইবেল। গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকডর্সের তথ্যমতে এটি হলো ছাপার যন্ত্রের সবচেয়ে প্রাচীন বই। প্রায় সাড়ে ৫০০ বছরেরও পুরনো এই বইটি ছাপা হয়েছিল আনুমানিক ১৪৫৫ সালে। গুটেনবার্গের হাতে ছাপা হওয়া ৫০টি বাইবেল আজও পাওয়া যায়। যার মধ্যে ২১টি পূর্ণাঙ্গভাবে নিউইয়র্কের পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত।গুটেনবার্গ এর বাইবেল ছাপানোর ঘটনার প্রায় চারশো বছর পর টাইপরাইটার আসলো এবং ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হলো মার্ক টোয়েনের লাইফ অন দ্য মিসিসিপি। এই বইটি ছিল টাইপরাইটারে কম্পোজ করা প্রথম বই। তবে ১৯৭১ সালে মাইক্রোপ্রসেসর আর ১৯৮৫ সালে সিডি আবিষ্কারের পর বই কম্পোজ আর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে গেছে। এরপর দ্রুত ইন্টারনেটের আবির্ভাব, অনলাইনে বই বিক্রির ব্যবস্থা আর ২০০৭ সালে ই-বুক রিডারের আবিষ্কার লেখক, প্রকাশক আর পাঠককে বইয়ের বাজার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। এখন নিত্য নতুন সাইট, বইয়ের নানা রুপের বাজারজাত এতে যোগ করেছে আরও বেশি বিচিত্রতা।

বই তৈরির ইতিহাস এবার একটু ভিন্নভাবে বলি। ইতিহাস ঘেঁটে জেনেছি, উপরে বর্ণিত ঘটনার বহু আগেও মানুষ বই লিখেছে এবং প্রকাশের স্বপ্নও মনের অজান্তে লালন করেছে। হয়তো লেখক তখন বুঝতেই পারেনি তার কাজটি আসলে বই বানানোর কর্ম! ইতিহাস বলছে, লিপি-কৌশল আয়ত্বে আসার আগেই মানুষ দড়িতে গিঁট বেঁধে বা কোনও কঠিন পদার্থের ওপর দাগ কেটে সঙ্কেত পাঠাতো। আর এইসব ঘটনার পরবর্তী স্তর চিত্রলিপি। মেক্সিকোর অ্যাজটেকরা, চীনের প্রাচীন অধিবাসীরা, মিশরের পিরামিডের দেয়ালে কিংবা মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার অধিবাসীরা সকলেই চিত্রলিপি ব্যবহার করতো। এ সময় কাঠের খণ্ডের ওপর অক্ষর খোদাই করার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, যাকে জাইলোগ্রাফি বলা হতো। পরে যাজকরা বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে কাগজের ওপর কাঠ-খোদাই ছাপ তুলে বিতরণ করতেন। এও কিন্তু এক ধরনের বই। যদিও বইয়ের সংজ্ঞায় এ জাতীয় উপাদানকে ফেলতে রাজি হবেন না অনেকেই।

এবারে প্রাচীন কিছু বইয়ের কথা বলি। দ্য ম্যাক্সিমস অব তাহোতেপ নামের প্রাচীন এক বইয়ের কথা ইতিহাসে আছে। এর বাংলায় অর্থ তাহোতেপের বাণী। এই বইটি লেখা হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ২৪০০ সালে। ফারাও সাম্রাজ্যের প্রধান উজির ছিলেন তাহোতেপ। বইটি মূলত তার বাণীর সংকলন। দুজন ফারাও সম্রাটের প্রধান উজির ছিলেন তিনি। ১৮ পাতার এই বইটি মূলত ছেলের জন্য লিখেছিলেন তাহোতেপ। মানুষের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কী কী পরিবর্তন হয়, নাগরিকের কর্তব্য কী; এ সবই তিনি এই বইয়ে ছোট আকারে লিখেছেন। বইটি এখন আছে ফ্রান্সের জাতীয় লাইব্রেরিতে।

৮৪০ সালে রচিত ইহুদিদের প্রাচীন প্রার্থনার বই সিডোয়ার। এ বইটি আবিষ্কৃত হয়েছে ২০১২ সালে। পশুর চামড়ার তৈরি কাগজে মূদ্রিত এই বইয়ের ভাষা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইংরেজির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। সিডোয়ার শব্দের অর্থ অর্ডার, বাংলায় বলা যায় আদেশ। এটি আসলে ইহুদিদের প্রতিদিনের প্রার্থনা গ্রন্থ। প্রাচীন ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তোওরাত (আসমানী কিতাব)-এর কিছু অংশ এতে আছে।

স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে প্রাচীন বইটির নাম কেলটিক সল্টার। লাল, সবুজ, বেগুনি, সোনালী কারুকাজ করা এগারো শতকের এই বইটি আসলে একটি উপাসনা পুস্তক। ছোট্ট পকেট সাইজের এই বইটি ল্যাটিন ভাষায় রচিত। মজার ব্যাপার হলো, এ বইয়ের লেখাগুলো আজও পাঠ উপোযোগী। বইটির আদি বাঁধাই অবশ্য এখন আর নেই। ধারণা করা হয়, স্কটল্যান্ডের রানী মার্গারেটের জন্য এই বইটি তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে এটি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বইটি সংরক্ষিত আছে। চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে পুরনো কবিতার সংকলন সিজিং বা ক্লাসিক অব পোয়েট্রি। তিনশোর বেশি লোকসংগীত, গীতিকাব্য, গান আছে এ সংকলনে। এ বইটি খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০-৬০০ সালের মধ্যে প্রকাশিত একটি কবিতার সংকলন। অনেকেই মনে করেন, কবিতার এই অসামান্য সংকলনটি করেছেন দার্শনিক কনফুসিয়াস। ফাইভ ক্লাসিকস নামের পাঁচটি খণ্ড আছে এতে। ধারণা করা হয়, এগুলো জহু সাম্রাজ্যের কবিদের লেখা। ওই সাম্রাজ্যের অধীনেই চীনা সংস্কৃতির পত্তন হয় বলে ধারণা করা হয়।

মিশরীয় প্রাচীন একটি বইয়ের কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করবো। এই বইটি মূলত পুঁথি। নাম ‘নাদ হামাদি’। এই বইটির আবিষ্কার নিয়েও একটি গল্প হতে পারে। ১৯৪৫ সালে দুজন মিশরীয় কৃষক কাজ করতে গিয়ে পাথরের খাঁজের আড়ালে একটা সিল করা পাত্রের ভেতরে তেরোটি পুঁথি পান। প্যাপিরাস কাগজে লেখা চামড়ায় বাঁধানো এই পুঁথিগুলো পাওয়া যায় মিশরের নাগ হামাদি শহরে। সেই থেকে এর নাম হয় নাগ হামাদি পুঁথি। কপটিক ভাষায় রচিত এই গ্রন্থেরও বিষয়বস্তু প্রাচীন ধর্মচিন্তা। ধারণা করা হয়, চতুর্থ শতকের দিকে এই বইটি রচিত হয়েছে। সভ্যতা যতটুকু এগিয়েছি, তার অনেকখানিই বইয়ের হাত ধরে। আমাদের পরিবর্তন ও আগামীকে সুন্দর করতে হলে বইয়ের হাত ধরতে হবে; থাকতে হবে বইয়ের সাথে।

প্রকাশিত পত্রিকা- দৈনিক মানবকণ্ঠ, ২৫ জুলাই, ২০২০

পুরোনো সেই বইয়ের কথা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top