পাঠক কমছে, বাড়ছে লেখক : হাসান হামিদ

আমার এই লেখাটি আপনি এখন পড়ছেন। আন্দাজ করতে পারি, এটি আপনি পড়ছেন সম্ভবত আপনার মুঠোফোন কিংবা ল্যাপটপ বা ডেস্কটপে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লিংক থেকে! যদি তা না হয়, তবে ব্যাপারটি অন্যরকম। কিন্তু স্বীকার না করলেও এই এখন সত্য যে, বেশিরভাগ তথ্য-তত্ত্ব-টেক্সট এখন মানুষের কাছে পৌঁছায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে, অনলাইনভিত্তিক মিডিয়ায়। তাহলে কাগজে ছাপা পত্রিকা কিংবা বই কি তেমন কেউ পড়েন না? নিশ্চয়ই পড়েন, তবে এ সংখ্যা কিছুটা কমে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে তবে হারাচ্ছে না। আবার বিশ্বজুড়েই কাগজের বইয়ের বিক্রি কিন্তু বাড়ছে, অবশ্য প্রিন্ট মাধ্যমের পাঠক ক্রম হ্রাসমান বলছে কোনো কোনো সমীক্ষা। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এখনকার সময়ে টেক্সট অন্যান্য মাধ্যমে পড়ছেন অন্তত ১০% পাঠক। অবশ্য কাগজে না পড়লেও অনেকের বাড়িতে রাখা হয় ছাপা পুস্তক-পত্রিকা! আর এটা তো জানা কথা, মানুষ যে কোনো কিছু জানতে এখন ইন্টারনেট ঘাঁটে, অথচ একসময় বই ছাড়া বিকল্প তেমন কিছু ছিল না।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যখন বিশ্বব্যাপী বাড়ছিল, তখন সবাই ভেবেছিল এই সময়ে ই-বুকের বিক্রি বাড়বে, কমে যাবে ছাপা বইয়ের বিক্রি। অথচ অবাক ব্যাপার হলো করোনাকালেও ছাপা বই-ই বিক্রি হয়েছে বেশি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে বিশ্বের বইয়ের বাজার ছাপা বই থেকে আয় করেছে ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ই-বুক বিক্রি হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। তবে সামনে এই ই-বুক বিক্রি কিছুটা বাড়বে, কেননা মানুষ বর্তমানে বেশি সময় কাটায় স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটারে। তবে এও নিশ্চিত যে, ছাপা বই খুব সহজে একেবারে হারিয়ে যাচ্ছে না। আমি অনেক লেখকের সাথে কথা বলে জেনেছি, তারা বই সংগ্রহ করেন কিন্তু অনেক সময় সব বই পড়া হয় না! আমাদের ঢাকায় সদ্য শেষ হওয়া অমর একুশে বইমেলায় প্রায় ৫২ কোটি টাকার বেশি বই বিক্রি হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। মনে প্রশ্ন জাগে, এর মধ্যে কত টাকার বই আসলে পঠিত হবে? যদিও এ হিসাব বের করা সম্ভব নয়। প্রমথ চৌধুরী তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘‘বই কিনলেই যে পড়তে হবে, এটি হচ্ছে পাঠকের ভুল। বই লেখা জিনিসটা একটা শখমাত্র হওয়া উচিত নয়, কিন্তু বই কেনাটা শখ ছাড়া আর কিছু হওয়া উচিত নয়।” আসলে আজকের দিনে নর্মান মেলরের মতো পাঠক পাওয়া সম্ভব কিনা ভাবতে হবে। তিনি বলেছিলেন, “আমি চাই যে, বই পাঠরত অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়”!

খোঁজ নিয়ে জেনেছি, প্রকাশকদের হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সালের করোনাকালীন বইমেলায় মোটামুটি ৩ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। আর করোনাকালের আগের সর্বশেষ মেলায় অর্থাৎ ২০২০ সালে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৮২ কোটি টাকার বই। ২০১৯ সালে প্রায় ৮০ কোটি টাকার, ২০১৮ সালের মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল ৭০ কোটি টাকার বই। ২০১৭ সালে বিক্রি হয়েছিল ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ২০১৬ সালে ৪২ কোটি, ২০১৫ সালে বই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২২ কোটি টাকার বই। আর ২০১৪ সালের বইমেলায় বই বিক্রি হয়েছিল মাত্র সাড়ে ১৬ কোটি টাকার। এ বছর ২০২২ সালের মেলায় অনেকে ভেবেছিলেন অনেক বেশি বই বিক্রি হবে। কিন্তু তা হয়নি। এবার বিক্রি হয়েছে ৫২ কোটি টাকার বই। ২০২০ সালের বইমেলায় বাংলা একাডেমি বিক্রি করেছিল মোট ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বই এবং ২০২১ সালে মাত্র ৪৬ লাখ টাকার বই। এবার বাংলা একাডেমি বিক্রি করেছে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকার বই।

একাডেমির দেওয়া তথ্যমতে, ২০২২ সালের মেলায় মোট বই প্রকাশ হয়েছে ৩ হাজার ৪১৬টি। অবশ্য নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২০ সালে নতুন বই এসেছিল ৪ হাজার ৯১৯টি। তবে এ হিসাব বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়া বইয়ের। এর বাইরেও মেলায় নতুন বই প্রকাশিত হয়ে থাকতে পারে। বাংলা একাডেমির বিচারে ২০২০ সালে মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা ছিল ৭৫১টি। আর ২০২২ সালে মানসম্পন্ন বই নির্বাচিত হয়েছে ৯০৯টি, যা পুরো বইয়ের ২৬ ভাগ। ২০২০ সালে এ হার ছিল ১৫ ভাগ। এই তথ্য উপাত্ত থেকে বলা যায়, মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা কিছুটা হলেও বেড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই যে মানসম্মত বা মানহীন বই নিয়ে এত কথা, প্রশ্ন জাগে এটা কোন বিবেচনায়? এ বছর আমাদের দেশের শীর্ষ অনেক প্রকাশনীর নতুন বই খুব একটা মানসম্মত নয় বলেই জেনেছি। বরং প্রকৃত সৃজনশীল ভালো মানের বই এসেছে ছোট ছোট প্রকাশনী থেকে। আবার একাধিক অন্য মাধ্যমের তারকার বইও ছাপেন কেউ কেউ, সেসব কি মানসম্মত বই? সরকারি আমলা, নেতা এ জাতীয় লেখক দিন দিন বাড়ছে। তাদের সবাই মানহীন তা বলছি না, কিন্তু বেশিরভাগের উদ্দেশ্য কিন্তু সাহিত্য রচনা নয়! যদিও বইয়ের বাধাই, মুদ্রণ, কাগজ ইত্যাদির বিবেচনায় তারা নিজদের বইকে সেরা ভাবতেই পারেন! তা ভাবুন, পাঠকরাই সময়ে বলে দেবে কে লেখক আর কে লেখক নন। আরেকটা বিষয় হল বাংলা একাডেমি মানসম্মত বইয়ের সংখ্যা বলে দিয়েই তাদের দায়িত্ব সেরেছে। একাডেমি কিন্তু বলেনি কোন বইগুলোকে তারা মানসম্মত বলতে পারছে না, কেন পারছে না!

প্রতিবছরই মেলার সময় মানসম্মত বই নিয়ে কথা উঠে। এরপর এটি আর কারো মনে থাকে না। আবার যারা এ নিয়ে কথা বলেন, তাদের অনেককে দেখি মানহীন লেখক বলে তারা যাদের কথা বিভিন্ন সিকি সভায় আলাপে জিকির তুলেছেন, তারা সেসব লেখকের পেছনে ডানে বামে কাচুমাচু দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন! অথচ কথিত এইসব উঁচু লেখক গবেষক যাদের আসলে খুব একটা পাঠক নাই তারাই বলে বেড়ান, কোয়ান্টিটি নয়, বরং কোয়ালিটি! অথচ প্রতিবছর মেলায় যে মানসম্মত কিছু বই প্রকাশ হয় তা কি অস্বীকার করার উপায় আছে? সেসব নিয়ে তাদের তো বলতে শুনি না!

আমার মনে হয়, একজন মানুষের দ্বিতীয়বার জন্ম হয়, যখন সে প্রথমবার পড়তে শিখে। কারণ সে তখন নতুন কিছু খুঁজে পায়, কিছু হয়তো গ্রহণ করে, কিছু বাদ দিতে শেখে। পড়তে পড়তে সে একসময় কিছু লিখতে চায়। বই প্রকাশ করতে চায়। তা লিখুক না! কে মানসম্মত, কে মানহীন তা সময়ই বলে দেবে! দুই দশক আগে দেদারছে বিক্রি হত যার বই, তার একজন পাঠকও এখন নেই, তেমন লেখক এ দেশে কিন্তু আছেন। আর আমাদের দেশের পাঠকের পাঠাভ্যাস নিয়ে তেমন কোনো জরিপ বা গবেষণা হয় না, যা বলা হয় আন্দাজে যার যা মনে আসে। কেবল ২০১৯ সালে ওআরজি-কোয়েস্ট একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল এ নিয়ে। সেখানে তরুণদের বই পড়ার হার আগের দুই বছরের চেয়ে সেই বছরে ৬ শতাংশ কমেছে বলে তথ্য উঠে এসেছিল। তাই আমি বলি কী, তরুণরা যারা লিখছেন, পড়ছেন; তাদেরও যদি মানহীন বলে তাড়িয়ে দেওয়ার পায়তারা করেন বিজ্ঞজনেরা, তবে উল্লেখিত সংখ্যা আরও কমে যাবে। যাবে না? অনেক বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ লেখক আছেন, যারা তাদের সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রাথমিক অবস্থায় তাদের প্রকাশিত বই কিংবা লেখালেখি খুব উন্নত ছিল না। পরে লিখতে লিখতে নিজস্বতা তৈরি হয়েছে। তবে হ্যাঁ, অনেক লেখক আছেন যারা বইয়ের মানের বিষয়ে একেবারেই বুঝেন না, কারণ তারা বই পড়েন না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, তারা মনে করেন লেখা মানেই ছাপা, আর ছাপাখানার বদৌলতে খুব সহজেই খেরোখাতা হয়ে যায় বই।

এবারের মেলার সময়, এটা প্রতিবারই হয়, কিছু লেখক মরিয়া হয়ে উঠেন নিজেকে বেস্টসেলার লেখক প্রমাণ করতে। আচ্ছা, পিঁপড়াকে কখনো প্রমাণ করতে হয় যে সে পিঁপড়া? কিংবা হাতিকে প্রমাণ করতে হয় যে সে আসলে হাতি? প্রমাণ করতে হয় না। অস্তিত্বই সেটি জানান দেয়। কেউ যদি সত্যি বেস্টসেলার হন, সেটি তাকে কোনো অনলাইন বই বিক্রির দোকানের একদিনের স্ক্রিনশট দিয়ে প্রমাণ করতে হবে কেন? কেউ বেস্টসেলার হলে পরিস্থিতিই সেটি জানান দেবে, পাঠকের ঘরে ঘরে তার বই থাকবে। যে দেশে বেশিরভাগ লেখকের বই-ই ছাপা হয় প্রথম মুদ্রণে তিনশ কপি, সেখানে নিজেকে এসবে শামিল করার অর্থ কী! একদিনের সেই স্ক্রিনশট একজন লেখককে আসলেই কি বিপুল পাঠকের মনে জায়গা করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? একদিন নিজে বা আত্নীয় বা পরিচিত পাঠকদের দিয়ে কিছু সংখ্যক বই একসাথে সংগ্রহ করিয়ে বেস্টসেলার লেখক হওয়ার চালাকি না করাই সুন্দর। আপনি লেখক, আপনি অনেক সম্মানিত মানুষ। লিখতে লিখতে একদিন নিশ্চয়ই পাঠক আপনাকে গ্রহণ করবে। প্রকৃত বেস্টসেলার লেখক কখনো বলে বেড়াবেন না, প্রমাণ করতে চাইবেন না যে, তিনি বেস্টসেলার। আমরা পাঠকরা তা বুঝতে পারব। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘‘একটি বই পড়ার দুটি উদ্দেশ্য থাকা উচিত; একটি হল- বইটিকে উপভোগ করা আর অন্যটি হল- বইটি নিয়ে গর্ব করতে পারা।’’ ভেবে দেখুন যে বইটি আপনি লিখছেন বা পড়ছেন সেটি কতটা প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয়, উপভোগ্য কিংবা একে নিয়ে গর্ব করা যায় কিনা!

শেষ কথা হল, আমাদের পড়তে হবে। লেখক হতে গেলে আরও বেশি পড়তে হবে। মার্ক টোয়েন এক লেখায় বলেছেন, ‘‘যার বই পড়ার অভ্যাস নেই আর যে পড়তে জানে না মানে নিরক্ষর, এই দুইজনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই’’। বই পড়লে মানুষের বিশ্লেষণী শক্তি বাড়ে। বাড়ে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আলোচিত উদ্যোক্তা এলন মাস্কের কথাই ধরা যাক। তাঁর বয়স যখন নয় বছর, তখন তিনি এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা সম্পূর্ণ পড়ে ফেলেছিলেন। সেই সময় তিনি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি পড়তেন দিনে গড়ে ১০ ঘণ্টা! আসুন নিজে বই পড়ি, পরিবারের ছোটদের বই পড়তে উৎসাহ দিই; তাতে তারা হয়ে উঠবে স্বপ্নবান মানুষ।

দৈনিক ইত্তেফাক
১ এপ্রিল ২০২২

পাঠক কমছে, বাড়ছে লেখক : হাসান হামিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top