নির্বাচনী সহিংসতা বন্ধে কমিশন কি কিছু ভাবছে?

হাসান হামিদ

সদ্য বিদায়ী বছরটিতে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট নানা সংকট, এই বিপর্যয়ের মধ্যেও অর্থনীতিকে সচল রাখার পদক্ষেপে সফল হওয়া, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ইউপি নির্বাচন এসব ছিল বাংলাদেশের মূল আলোচ্য বিষয়। কিন্তু এতদিন যে ইস্যুই বাংলাদেশের গতি প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করুক না কেন; অনেককিছুকে সম্ভবত ছাপিয়ে গেছে ইউপি নির্বাচনে ভয়াবহ রকমের সহিংসতা। আশেপাশে তাকালে, কথা বললে বুঝি যে, খেটে খাওয়া মানুষ, ব্যবসায়ী বা রাজনীতির বিশ্লেষক- সবার মধ্যে এই নির্বাচনকে ঘিরে একটা হতাশা কাজ করেছে। আসলে স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের সাধারণ মানুষজনের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা। কিন্তু প্রত্যাশিত নির্বাচনটি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে মূলত নানা কারণে। আসলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে রয়েছে নানা রকম চ্যালেঞ্জ। সেসব মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন কতটা দক্ষ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

২০২১ সালে শুরু হওয়া ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এখনও। ইতোমধ্যে প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছে ২১ জুন ও ২০ সেপ্টেম্বর ৩৬৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। এরপর ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৩টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়। আর তৃতীয় ধাপে ২৮ নভেম্বর ২ হাজার ৭টি এবং চতুর্থ ধাপে ২৩ ডিসেম্বর ৮৪০টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বছর ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম ধাপে দেশের ৭০৮টি ইউপিতে নির্বাচন হল। আর ষষ্ঠ ও শেষ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আগামী ৩১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। কমিশন বলছে, সারাদেশের মোট ২১৯টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে শেষ এই ধাপে।

হতাশার ব্যাপার হলো, ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া ইউপি নির্বাচনের পঞ্চম ধাপের ভোট স্বস্তির ভাবে সম্পন্ন হয়নি। যখন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় আর চতুর্থ ধাপ নির্বাচন হয়, তখন একটি নির্বাচনও শান্তিপূর্ণ হয়নি। পঞ্চম ধাপের আগে তাই সাধারণ মানুষের আশঙ্কা ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন আগের ধাপগুলোর মতোই সহিংসতা ঘটবে এই ধাপেও। এই আশঙ্কা কিন্তু অমূলক নয়। কারণ নির্বাচন কমিশন এসব দেখে শুনেও খুব একটা ভাবছে বলে মনে হয় না, এটা বেশিরভাগ মানুষ বুঝে গেছে। আর হয়েছেও তাই। পঞ্চম ধাপের ভোটে সহিংসতায় মারা গেছেন ১১ জন। এই ধাপের ভোটে দেশের বিভিন্ন জায়াগায় মারামারি, হামলা, সংঘর্ষ, গোলাগুলি, গাড়ি ভাঙচুরের মতো ঘটনায় এসব প্রাণহানি হয়েছে। এই ১১ জন নিহত হওয়া ছাড়াও অনেকে আহত হয়েছেন। সেই পরিসংখ্যান সম্ভবত কমিশনের কাছে স্পষ্টত নেই। পত্রিকায় পড়েছি, সেই সব সহিংসতার খবরকে উল্টো তারা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

আমাদের দেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে যে আশঙ্কা জনগণের মাঝে তৈরি হয়েছে, তার দায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না। আর সহিংসতা বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা। কেননা আইন ও বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনের যথেষ্ট ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তার যথাযথ প্রয়োগ তারা করছে না। করলে এমন ঘটনা পরপর সব ধাপে এত ঘটতো না। ইউপি নির্বাচনের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ ধাপে যেসব সহিংসতা হয়েছিল, সেসব নিয়েও কমিশনের মাথাব্যথা ছিল না বলেই মনে হয়। কেননা তারা সেইসব ঘটনার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলেই জেনেছি। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম ধাপের আগে যে চার ধাপ নির্বাচন হয়েছে তাতেও ভোটের আগে-পরে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। ওই চার ধাপে মোট ২ হাজার ৮৪২টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন হয়েছে। তথ্য বলছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে সহিংসতায় সারা দেশে এ পর্যন্ত প্রাণহানি হয়েছে ৯৭ জনের। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে দ্বিতীয় ধাপে। ওই ধাপের নির্বাচন ঘিরে ৩০ জন নিহত হয়েছিলেন। কী ভয়াবহ ব্যাপার!

বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নির্বাচনে নিহত-আহত নিয়ে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল কিছুদিন আগে। সেখানে তারা জানিয়েছে, ২০২১ সালে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত ইউপি, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪৬৯টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আর সেসব ঘটনায় আহত হয়েছেন মোট ৬ হাজার ৪৮ জন এবং নিহত হয়েছেন ৮৫ জন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪১ জন, বিএনপির ২ জন, সাধারণ মানুষ ২২ জন, পুলিশের গুলিতে ১৫ জন এবং সাংবাদিক মারা গেছেন একজন।

নির্বাচনে এইসব সহিংসতার একটা বড় কারণ হচ্ছে দলভিত্তিক নির্বাচন। এবার দেখা গেছে, বেশিরভাগ সহিংসতা হয়েছে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আর বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে। এজন্য এটি রোধ করতে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যারা রাজনীতি করেন, তাদের মানসিকতার পরিবর্তনের। এখন অনেকেই মনে করেন, রাজনীতি মানেই দলীয় ফায়দা লাভ, ঠকবাজি করে টাকা কামানো। এই সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশ যদি বেড়িয়ে না আসতে পারে, এ ব্যাপারে সরকার ও নীতি নির্ধারকেরা যদি কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ না করেন, তবে সামনে আরও ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছে।

নির্বাচন যথাসম্ভব দোষমুক্ত হোক এটা সকলে চায়। যদিও প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনই সৎ, দুর্নীতিমুক্ত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। ১৯৭২ সালের সংবিধানের অধীনে ১৯৭৩ সালে যে প্রথম নির্বাচন হয়েছিল, সেটা সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া খুব স্বাভাবিক ও সম্ভব ছিল। কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে যে, তা হয়নি। যেখানে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৮০ বা ২৭৫ আসনে জয়লাভ নিশ্চিত ছিল, সেখানেও নির্বাচন ঠিকমতো অনুষ্ঠিত হয়নি! ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের ফলাফল টেলিভিশনে প্রচারিত হতে থাকার সময়ে দেখা গেল, বেশ কয়েকজন বিরোধীদলীয় প্রার্থী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর থেকে বেশি ভোট পেয়ে এগিয়ে আছেন এবং জয়লাভের সম্ভাবনা যথেষ্ট বা ষোলআনা। কিন্তু সেই অবস্থায় তাদের নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। অনেক পরে যখন আবার তাদের নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা শুরু হল তখন দেখা গেল, তারা আর এগিয়ে নেই। শেষ পর্যন্ত কম ভোট পেয়ে তারা হেরে গেলেন! যারা এভাবে ‘হেরে’ গেলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ডক্টর আলীম আল রাজি, মেজর জলিল, রাশেদ খান মেনন প্রমুখ। নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে ২৫-৩০ জন বিরোধী প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু একমাত্র আতাউর রহমান খান ছাড়া আর কারও পক্ষে জয়লাভ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশে এরপর থেকে প্রত্যেক নির্বাচনেই অল্পবিস্তর দুর্নীতি ও কারচুপি হয়েছে।

এভাবে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অতীতেও নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে প্রায় সব সময়। এই চিন্তা থেকেই বলা যায় এবার যাতে নির্বাচনে কোনো ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটে সেই জন্য কর্তৃপক্ষের সজাগ হওয়া দরকার ছিল।

নির্বাচনের একটা লক্ষ্য হল, এর মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন ঘটানো। উন্নত ও অগ্রসর দেশগুলোতে সম্পূর্ণভাবে না হলেও এই লক্ষ্য অনেকখানি অর্জিত হয়। কিন্তু অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে সেটা হয় না। আমরা জানি, যখন কোনো দেশ রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন তার মূল বিষয়ই হচ্ছে সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক সহাবস্থান এবং সমঝোতা। এর ব্যত্যয় ঘটলেই রাজনীতিতে অস্থিরতা এবং বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আপাত দৃষ্টিতে আমাদের বর্তমান রাজনীতি স্থিতিশীল মনে হচ্ছে। এ স্থিতিশীলতা যে স্বাভাবিক নয়, তা একজন সাধারণ মানুষও জানে। এদেশে একদলের নেতারা অন্য দলের নেতাদের নির্বোধ ভাবেন। কিন্তু রাজনৈতিক লাভ কে কীভাবে কতোটা নিচ্ছে তা বুঝতে হলে একটি গল্প শুনতে হবে আপনাকে। এক দোকানী এক ক্রেতাকে তার দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটি বালককে দেখিয়ে বলে, ‘এর চেয়ে গর্দভ বালক আমি জীবনে দেখিনি।’ ক্রেতা জিজ্ঞেস করে, ‘কেন কী করেছে সে!’ দোকানী বলে, ‘দাঁড়ান দেখাই আপনাকে।’ দোকানী বালকটিকে ডাকে, এক হাতে দুটো ৫০ টাকার নোট আর আরেক হাতে ৫০০ টাকার নোট নিয়ে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে কোন হাতেরটা নেবে তুমি! ছেলেটা দুটো ৫০ টাকার নোট নিয়ে চলে যায়। দোকানী ক্রেতাটির দিকে তাকিয়ে আমুদে হাসি দিয়ে বলে, ‘কী বলেছিলাম! এই ছেলেটি একেবারেই বোকা।’ ক্রেতা দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে দেখে বালকটি আইসক্রিমের দোকান থেকে আইসক্রিম কিনে বেরুচ্ছে। বালকটিকে জিজ্ঞেস করে, ‘ওই দোকানীর আরেক হাতে ৫০০ টাকার নোট থাকতে তুমি দুটো ৫০ টাকার নোট নাও কেন!’ ছেলেটি বলে, ‘যেদিনই আমি ৫০০ টাকার নোটটা নেবো ওইদিনই ওই দোকানীর এই খেলার আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে; মানে আমারো খেলা শেষ।’

দেশের প্রায় সব নির্বাচনই অঘটনে পরিপূর্ণ। অথচ জনগণ আসলে কী চায়? তারা চায়, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সকলে ভোট দেবে। কিন্তু সেসব হচ্ছে না। আর তাতে আগ্রহ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এখন আর নিশ্চিন্ত মনে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদান করার কথা ভাবে না। শেষ কথা হল, আগামী দিনে আরও নির্বাচন হবে। সেসব নির্বাচন কতোটা কেমন হবে তা দেখার জন্য আমরা অপেক্ষা করে আছি। তবে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার নামে রাজনীতিবিদের যেনো রাষ্ট্র বিজ্ঞানের বারোটা না বাজিয়ে ফেলেন, আমাদের এটাই অনুরোধ। আজকের লেখাটি শেষ করছি গল্প দিয়ে-

ভোটকেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই ভোটার—সলিম আর জব্বার। সলিম: জব্বার, দোস্ত দেখ, তুই কলা মার্কায় ভোট দিবি। আর আমি মুরগি মার্কায়। দুজনের ভোট  কাটাকাটি হইয়া গেল। কেউ আগাইল না, পিছাইলও না। তাইলে আমাগো ভোট দিয়া কী লাভ? জব্বার: ঠিকই তো কইলি। তাইলে আর লাইনে দাঁড়ায়া কী হইব? চল, যাইগা। দুজন লাইন থেকে বেরিয়ে এল। পেছন থেকে এক বৃদ্ধ সলিমকে বললেন, ‘দুজন মিলে ভালোই তো চুক্তি করলা।’ ‘হ চাচা, সকাল থেকে পাঁচজনের সঙ্গে এই চুক্তি করছি।’ সলিমের জবাব।

নির্বাচনী সহিংসতা বন্ধে কমিশন কি কিছু ভাবছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top