দেশে রোমহর্ষক খুনের ঘটনা বাড়ছে

হাসান হামিদ

বাংলাদেশে আগের তুলনায় কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে কমে আসছিল হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকেই হঠাৎ বেড়েছে রোমহর্ষক খুনের ঘটনা। সেই সাথে শহর এলাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে চুরি-ছিনতাইসহ এ জাতীয় কর্মকাণ্ড। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর থাকলেও ঘটছে একের পর এক ঘটনা। পত্রিকার খবর বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ২০২২ সালের প্রথম দুই মাসে প্রতিদিন সারা দেশে গড়ে ৭ জন করে খুন হয়েছেন। মাত্র দুই মাসে দেশে মোট হত্যাকাণ্ড ঘটেছে চার শর বেশি। তাছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে শুধু ঢাকা শহরেই খুন হয়েছেন ৮ জন। সর্বশেষ আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ)। সেদিন রাত আনুমানিক ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে খুন হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু এবং বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী প্রীতি। এর রেশ না কাটতেই শনিবার (২৬ মার্চ) রাজধানীর সবুজবাগের একটি বাসায় দুই শিশুসন্তানের মুখ বেঁধে রেখে তাদের মা মুক্তা আক্তারকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এরপর রবিবার (২৭ মার্চ) ভোরে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেছে আহমেদ মাহী বুলবুল নামের এক দন্ত চিকিৎসকের। এসব নৃশংস হত্যার পাশাপাশি খুনের পর লাশ গুমের ঘটনাও ঘটছে। পুলিশ বলছে, সামাজিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ, জমিজমা দখল, ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ ও সমস্যা, আর্থিক লেনদেনে সমস্যা, মাদক এবং কোথাও কোথাও রাজনৈতিক কারণে এসব হত্যার ঘটনা ঘটেছে দেশজুড়ে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই ১২ বছরে সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৪৫ হাজার ১৪৬টি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৪৫৮টি। এর আগের বছর ২০২০ সালে মানুষ খুন হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৯ জন। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ জন করে খুন হয়েছে ওই বছর। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৫৩। তবে করোনাকালে বেশ কয়েকটি নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোতে পরিবারের সদস্য বা স্বজনেরাই জড়িত। স্ত্রী, সন্তান বা মা-বাবাসহ পরিবারের ছোট্ট শিশুকে পর্যন্ত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। করোনাকালে নানামুখী দুশ্চিন্তা, হতাশা ও অস্থিরতাকে এ জন্য দায়ী মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা। তথ্যমতে, ২০১৮ সালে সারা দেশে খুন হয়েছেন ২ হাজার ৬১৭ জন আর ২০১৭ সালে বিভিন্ন ঘটনায় খুন হয়েছেন ৩ হাজার ৫৪৯ জন। ২০১৬ সালে ৩৫৯১ জন, ২০১৫ সালে ৪ হাজার ৩৫ জন, ২০১৪ সালে ৪ হাজার ৫২৩ জন, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৫৮৮ জন, ২০১২ সালে ৩ হাজার ২৮৮ জন, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৯৮৮ জন এবং ২০১০ সালে ৪ হাজার ৩১৭ জন খুন হয়েছেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কন্যা শিশুসহ ৪৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এরমধ্যে ১-১৮ বছরের শিশু ৫ জন এবং নারী ৩৯ জন। হত্যা-চেষ্টা করা হয়েছে ৬ জন শিশু ও ১২ জন নারীকে। বিভিন্ন কারণে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে শিশু ৬ জন এবং নারী ৪১ জনের। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের ২১০টির বেশি হত্যাকাণ্ডে ভুক্তভোগী লোকজন মামলা করেছেন। আর গত বছর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে খুন হয়েছিলেন ২৬৫ জন। এর আগে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ২৯৭। তাছাড়া গত ৩ বছর ধরে তুচ্ছ কারণে হত্যার ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে। বিশেষ করে এখন ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা ও পারিবারিক বিরোধের কারণে খুনের ঘটনা ঘটছে বেশি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ঘটে যাওয়া এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্যতম কারণ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ, পরকীয়া, জমিসংক্রান্ত বিরোধ ও মাদকের অর্থ জোগাড়। তারা বলছেন, ইন্টারনেটের অপব্যবহার. অসহিষ্ণুতা, অতিমাত্রার ক্ষোভ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেও মানুষের মাঝে দিন দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে নিষ্ঠুরতা। তুচ্ছ কারণেই অসহিষ্ণু হয়ে এইসব খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা। তবে বীভৎস বিকৃত খুনের ঘটনার বেশিরভাগই ঘটছে অপেশাদার খুনিদের মাধ্যমে। এমন বীভৎস হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়া সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন দেশের ৫৩টি জেলার ৫৭ হাজার ৭০৪ জন নারী ও শিশুর ওপর জরিপ চালিয়েছে। তাতেও দেখা যায়, সম্প্রতি পারিবারিক সহিংসতা গত কয়েক বছরে দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।
খুনের পাশাপাশি সম্প্রতি শহর এলাকায় চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। তাতেও খুনের মত ঘটনা ঘটে যায়। বিশেষ করে ঢাকায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দূরপাল্লার বাস, রেল ও লঞ্চ ভোরে যে টার্মিনালেই থামুক, ছিনতাইকারীর শকুনিচোখ থাকে যাত্রীদের দিকেই। ভোরে রাজধানীতে পা রেখেই কিছু টের পাওয়ার আগেই যাত্রী ছিনতাইকারীর শিকার হয়ে যান। পরিসংখ্যানও বলছে, ঢাকায় বেড়েছে চুরি-ছিনতাই। ডিএমপির তথ্য বলছে, ২০২১ সালে রাজধানীতে চুরির ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ২৬টি, ২০২০ সালে ৮৭৪টি, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৮৭টি, ২০১৮ সালে ৮৬৯টি, ২০১৭ সালে ৭৮৯টি, ২০১৬ সালে ৯৫৬টি, ২০১৫ সালে ৯৬৮টি ও ২০১৪ সালে ৮৮২টি। আর ২০২১ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয় ১৪৫টি, ২০২০ সালে ১৭৬টি, ২০১৯ সালে ১৫৫টি, ২০১৮ সালে ২১৬টি, ২০১৭ সালে ২১৮টি, ২০১৭ সালে ১০৩টি, ২০১৬ সালে ১৩২টি, ২০১৫ সালে ২০৫টি ও ২০১৪ সালে ২৬৫টি। তবে মামলার রেকর্ড থেকে প্রকৃত চুরি-ছিনতাইয়ের ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ অধিকাংশ এলাকায় থানা পুলিশ ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা নিতে চায় না। এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘ভালো’ দেখাতে ছিনতাইয়ের শিকার ভুক্তভোগী থানায় গেলেও মালপত্র হারানোর জিডি নথিভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। আবার বেশিরভাগ ভুক্তভোগী থানায় পা মাড়াতে চান না। ফলে অপরাধের সঠিক তথ্য মেলে না।
খুনের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে এমন অপরাধের মধ্যে অ্যাসিড নিক্ষেপ, পরকীয়া, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন উল্লেখ করার মতো বেড়েছে। অবশ্য সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের ফলে দেশে অ্যাসিড–সন্ত্রাস অনেকাংশে কমে এলেও পত্রিকার খবর থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০২০ সালে ১৬টি অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। আগের বছর ২০১৯ সালে এমন ঘটনা ছিল ১২টি। করোনাকালে বা বিভিন্ন সময়ে সরকার লকডাউন বা বিধিনিষেধ দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিলেও মাদক চোরাচালান ও বিক্রি বন্ধ হয়নি। পুলিশের হিসাবে ২০২০ সালে ৭৩ হাজারের বেশি মাদকদ্রব্য আইনে মামলা হয়েছে, যা আগের বছর ২০১৯ সালে ছিল ১ লাখ ১১ হাজারের মতো। ২০২০ সালে সারা দেশে ৬ হাজার ৫৫৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দেশে দৈনিক গড়ে ১৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পাশাপাশি খুনের ঘটনাও অনেক। এর আগের বছর ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫ হাজার ৮৭২টি। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, কয়েক বছর ধরেই ধর্ষণের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলছে। পাশাপাশি শিশু নির্যাতনের ঘটনাও পাঁচ বছর ধরে বেড়েছে। ২০২০ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল আড়াই হাজারের বেশি। আর ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৬৩।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, বর্তমান সময়ে খুনের ঘটনাগুলো বেড়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতায়। এক পক্ষ অপর পক্ষকে হামলা করছে। এসব অস্থিরতার কারণে আমাদের খুনের মতো অপরাধগুলো বাড়ছে। আরেকটি পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ের সূত্র ধরে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটনাগুলো বাড়ছে। এদিকে আবার সম্পর্ককেন্দ্রিক ইস্যুগুলোকে ছোট করে ধরা যাবে না। সেটি একসময় বড় আকার ধারণ করে। পরস্পরের বিশ্বাসের জায়গাগুলো যখন কেউ শতভাগ পূরণ করতে অথবা প্রত্যাশিত মাত্রা অর্জন করতে পারে না তখন এই ধরনের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে মাদককেরও সংশ্লিষ্টতা আছে। মাদক নিয়ন্ত্রণকেও কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা বাড়ছে।
কেন মানুষ খুন করার মতো অপরাধে লিপ্ত হয়? কিছুদিন আগে প্রকাশিত সাইকিয়াট্রি অ্যাডভাইজারের এক গবেষণা প্রতিবেদনে তা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষের খুনি হয়ে ওঠার পেছনে জেনেটিক, সামাজিক পরিবেশ ও বাস্তবতার নিরিখে অপরাধীর আচরণ সমানভাবে দায়ী। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) কর্মকর্তা জিম ক্লেমেন্ট বলেছেন, মানুষের জেনেটিক কারণ বন্দুকটিকে লোড করে ফেলে, তাদের ব্যক্তিত্ব ও মানসিক কারণ শিকারকে তাক করে এবং তাদের অভিজ্ঞতা ট্রিগারে চাপ দেয়। আর এভাবেই একজন মানুষ আরেকজনকে খুন করে।

সাম্প্রতিক দেশকাল
৩১ মার্চ ২০২২

দেশে রোমহর্ষক খুনের ঘটনা বাড়ছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top