গ্যাসের তীব্র সংকটে রাজধানী : হাসান হামিদ

প্রায় মাসখানেক ধরেই গ্যাসের কম-বেশি সংকট ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়। আর সেটি তীব্র হতে থাকে ১২ জানুয়ারির পর। গত বৃহস্পতিবার অনেক জায়গায় গ্যাস একেবারেই ছিল না। এরপর আসে-যায় এ রকম চলছে। গ্যাস উত্পাদনের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি বিবেচনায় এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র গ্যাসের সংকট। বাংলাদেশের ইতিহাসে গ্যাসের এমন সংকট এর আগে কখনোই দেখা যায়নি। সূত্র বলছে, চাহিদার চেয়ে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ কমে গেছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। এই ঘাটতি নিয়েই চলবে আরও কয়েকদিন। ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখের পর গ্যাসের এই ঘাটতি কমতে শুরু করার পূর্বাভাস দিচ্ছেন দায়িত্বশীল কেউ কেউ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরও কিছুদিন বেশি সময় লাগতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীবাসীর চুলা জ্বলে না। কোনো কোনো এলাকায় গ্যাস থাকে না রাতেও। এখন দিনে চাহিদা রয়েছে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সরবরাহ হয়েছে ২৭২৬ মিলিয়ন ঘনফুট। শুধু সেদিনই ঘাটতি দাঁড়াল ১২৭৪ মিলিয়ন। আর গ্যাস আমদানির জন্য দুটি টার্মিনালের একটি অচল হয়ে আছে মুরিং ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে। মুরিং হলো একটি স্থায়ী কাঠামো, যেখানে কোনো জাহাজ বাঁধা অবস্থায় থাকে। অন্য টার্মিনালটির সরবরাহ ক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেই টার্মিনালও সেদিন সরবরাহ করেছে ৩৮৪ মিলিয়ন ঘনফুট। আগে যেখানে প্রতিদিন ৬০০-৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসতো সেখানে গত বৃহস্পতিবার এসেছে ৪০০ মিলিয়ন। ফলে গ্যাসের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। আর এই সংকটের কারণে কোথাও কোথাও ছোটখাটো বিক্ষোভ মিছিল পর্যন্ত হয়েছে।

গ্যাসের ঘাটতির কথা বললে পেট্রোবাংলার তরফ থেকে বলা হয়, অনেক গ্যাস চুরি হচ্ছে। আমরা এলএনজি আনতে পারছি না। বঙ্গোপসাগরে স্থাপিত সামিটের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ কমে গেছে। সক্ষমতার চেয়ে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। অন্যদিকে শেভরন বাংলাদেশ পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার একটি কূপের ওয়ার্কওভারের কাজ শুরু হয়েছে। এ জন্য প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে কম যোগ হচ্ছে প্রায় ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। আবার এখন শীতকাল চলছে। এই সিজনে পাইপলাইনের ভিতর পানি জমে যাওয়ায় গ্যাসের সংকট দেখা দেয়। এর সঙ্গে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার বিষয়টিও জড়িত।

তিতাস গ্যাস কোম্পানি বলেছিল, চলতি সংকট ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। গ্যাসের ঘাটতি আরও বেড়েছে। সূত্র বলছে, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসেও গ্যাসের এমন সংকট  ঢাকা ও এর আশপাশের মানুষকে ভোগাবে। তিতাস গ্যাস কোম্পানি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ১২ জানুয়ারি জানিয়েছিল, বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। তিতাসের অধিভুক্ত এলাকাগুলোতে এই স্বল্প চাপ থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট করে কোনো এলাকায় নয়, সব এলাকাতেই গ্যাস ঘাটতি হতে পারে। সামিটের এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের সংস্কার কাজের জন্য গ্যাসের ঘাটতি সৃষ্টির শঙ্কা করছে জ্বালানি বিভাগ। সেদিন সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলা বলেছিলেন, কারিগরি কারণে ১২ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিতাস গ্যাসের অন্তর্গত এলাকায় গ্যাসের চাপ স্বল্প থাকতে পারে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ২১ জানুয়ারির পর সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র গণমাধ্যমে জানিয়েছে, এলএনজি আমদানি কমেছে ২০২১ সালের ডিসেম্বরের শুরু থেকেই। সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। আর গ্যাসের উৎপাদনে চাপ কমে আসায় সম্প্রতি বিবিয়ানায় সংস্কারকাজ শুরু করেছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। এ কাজ শেষ হতে পারে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। এই শেভরন বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদন ক্ষেত্র। এটি থেকে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা, সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন, আবাসিকসহ সকল জায়গায়। তারা জানায়, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামঝি সময় থেকে সিএনজি স্টেশন দিনে চার ঘণ্টা বন্ধ রাখা হচ্ছে। এক খাত থেকে কমিয়ে আরেক খাতে সরবরাহ বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবুও এই সংকট তৈরি হলো।

এদিকে জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, দিনে ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা আছে মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে নোঙর করা ভাসমান দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে। ২০২১ সালের ১৮ নভেম্বর বিকেলে সামিটের টার্মিনালের মুরিং লাইন ছিঁড়ে যায়। টার্মিনালে জমানো এলএনজি থেকে ১০ দিন পর্যন্ত সরবরাহ করে সামিট। এরপর থেকে সরবরাহ বন্ধ। বর্তমানে এটি মেরামতের কাজ চলছে। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এটি চালু করা হবে বলে লিখিতভাবে জানিয়েছিল সামিট। তবে আরও এক সপ্তাহ বেশি সময় লাগতে পারে বলে সম্প্রতি মৌখিকভাবে ধারণা দিয়েছে কোম্পানিটি। আর এই টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় দিনে ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা কমে গেছে।

এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বলছে, কয়েকটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও তা বিধিসম্মত না হওয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব পাওয়ার পর শুনানি শেষে দাম বাড়ানোর বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন বিইআরসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে আপাতত আমদানির বিকল্প নেই। তাতে খরচ অনেক। তাই দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু দাম বাড়ালেও অনেক স্বল্প আয়ের মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের চাহিদা সাধারণত সবচেয়ে বেশি হয় গ্রীষ্মকালে। কেননা বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। আর সেই চাহিদা গরমের দিনে বেশি থাকে। কিন্তু এবার শীতকালেই দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় আসছে গ্রীষ্মকালে গ্যাসের এই সংকট আরো তীব্র হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন তারা। সবমিলিয়ে তারা মনে করেন, গ্যাসের এমন সংকটের স্থায়ী সমাধান দরকার। এই ঘাটতি দ্রুত মেটানো না গেলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে।

গ্যাসের তীব্র সংকটে রাজধানী : হাসান হামিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to top